
অনিরুদ্ধ সরকার,বাঁকুড়াঃ অনান্য দিনের মতোই এদিনও রুজির টানে কারখানায় কাজ করতে এসেছিলেন কর্মিরা। চলছিল ভাটিতে লোহা গলানোর কাজ, কাজ শুরুর সাথে সাথে হঠাৎই বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেপে উঠল সমগ্র কারখানা চত্ত্বর। স্পঞ্জ আয়রন কারখানার ব্লাস্ট ফার্নেসে ফেটে গরম ধাতব তরলে গলে গলে পড়ল কর্মিদের শরীরে। মুর্হুর্তের মধ্য ঝলসে যাওয়া শরীর নিয়ে আর্ত চিৎকারে ছোটাছুটি কর্মিদের। ঘটনায় চাঞ্চল্য শুরু হয় কারখানার ভেতর ও কারখানার বাইরে। মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে বাঁকুড়ার বড়জোড়ার শিল্পতালুকের একটি বেসরকারি স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় ।
মঙ্গলবার বেলা ১১টা নাগাদ ঘুটগোড়িয়ার ওই কারখানায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, কারখানার ব্লাস্ট ফার্নেসেই বিস্ফোরণ হয়েছে। বেসরকারি ওই স্পঞ্জ আয়রন কারখানার চুল্লি ভাটি ফেটে গুরুতর আহত হলেন ১৭ জন শ্রমিক। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বড়জোড়া থানার পুলিশ। অন্যদিকে আহতদের তড়িঘড়ি বড়জোড়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ জনকে পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বড়জোড়ার আইএনটিটিইউসির সভাপতি পার্থ গুইন জানান, মেটাল কারখানার আহতদের মধ্যে ১০জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এঁদের প্রত্যেকেরই ৮০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে। খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছেন বড়জোড়ার বিধায়ক অলোক মুখার্জী। তিনি বলেন, “হাসপাতালে জখমদের চিকিৎসা চলছে। আমরা আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় দেখভাল করছি। ১০ জনের অবস্থা গুরুতর। কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি কথা বলব। আহতদের সমস্ত রকমের চিকিৎসার খরচ বহন করা হবে।একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এটি। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি”।
কারখানার এক শ্রমিক জানান, “বিডি গোয়েল নামের এই বেসরকারি স্পঞ্জ আয়রন কারখানাটিতে শ্রমিকেরা আজ কাজ করছিলেন । আচমকাই কারখানার চুল্লি খুব জোরে ফেটে যায়। চুল্লির মধ্যে তরল অবস্থায় থাকা ফুটন্ত লোহা ছিটকে পড়ে চার দিকে। চুল্লির কাছেই যে সমস্ত শ্রমিক ছিলেন, তাঁদের গায়ে গিয়ে পড়ে ওই গলে যাওয়া লোহা।আমরা সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাই”। মঙ্গলবার সকাল ৯ টা নাগাদ এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানা গিয়েছে। এদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কারখানার রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আপত্তি জানানো হচ্ছিল। বারবার অভিযোগ সত্বেও এই ব্যাপারে কারখানা কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেয়নি বলে দাবি তাঁদের।এর জেরেই মঙ্গলবারের বিস্ফোরণ বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আহতদের ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন শ্রমিকরা। আর এর ফলে শ্রমিকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিরোধী দলের শ্রমিক ইউনিয়নগুলি।
সিপিআইএমের জেলা কমিটির সম্পাদক অজিত পতি জানিয়েছেন, “সেই মান্ধাতার আমলে যা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল, এখনও সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করে চলেছেন শ্রমিকরা।এই বিস্ফোরণ যে আজ হঠাৎ করে হয়েছে তা নয়। এটা বহুদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফল। শ্রমিকদের চিকিৎসার দায়িত্ব কারখানা কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে। কিছুদিন কাজে না আসতে পারে বেতন কাটা যাবে না”। এদিকে কারখানার কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হত কি না, সুরক্ষাবিধি ঠিকঠাক মেনে চলা হত কি না… সেই সব প্রশ্ন ইতিমধ্যেই ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। যদিও গোটা ঘটনা প্রসঙ্গে মুখে কুলুপ এটেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।
