
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: সরকার পরিবর্তনের পর রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একাধিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে শুভেন্দু সরকার। শনিবার স্বাস্থ্য দফতরের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, রাজ্যে কবে থেকে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু হবে এবং কোন কোন মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। জনতার মনে আশঙ্কা ছিল, স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের উপভোক্তারা আদৌ কেন্দ্রের এই প্রকল্পটির সুবিধা পাবেন কিনা। এদিন সেই আশঙ্কা উড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে যাঁরা বিগত সরকারের স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের সুবিধা পান, তাঁরা এখন থেকে সরাসরি আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পাবেন। জুলাই থেকেই আয়ুষ্মান ভারত কার্ড মিলবে। পরে এই প্রকল্প আরও বৃহৎ আকারে চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রকল্পের জব্য ৯৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মুহূর্তে বাংলার ৬ কোটি মানুষ প্রাক্তন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সুবিধা পেতেন। শনিবার স্বাস্থ্য বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘‘যে ৬ কোটি মানুষ এখন স্বাস্থ্যসাথীর সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁরাই সরাসরি আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পাবেন। পরে এই প্রকল্পের আওতায় আরও মানুষ যুক্ত হবেন। নতুন যাঁরা যুক্ত হতে চান, তাঁরা জুলাই থেকে আবেদন করতে পারবেন।” তাঁর আরও ঘোষণা, ‘‘জুনের প্রথম সপ্তাহে আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির তৈরির প্রকল্পের চুক্তি হবে দিল্লিতে, কেন্দ্রের সব স্তরের আধিকারিকরা থাকবেন সেখানে। শুধু বাংলায় নয়, কাজ বা শিক্ষার কারণে গোটা ভারতে যেসব পশ্চিমবঙ্গবাসী বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছেন, তাঁরা সকলে যাতে আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির অর্থাৎ বিনামূল্যে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলি থেকে পরিষেবার সুবিধা পান, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই কারণেই দিল্লিতে বসে চুক্তি হবে।”
রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আমলে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু নিয়ে বিস্তর টানাপোড়েন ছিল রাজ্য-কেন্দ্রের মধ্যে। কেন্দ্রের ওই প্রকল্পের চেয়ে অধিক সুবিধা দিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চালু করেছিলেন স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প। এর আওতায় রাজ্যের সমস্ত পরিবারের মহিলাদের নামে এই কার্ড দেওয়া হয়। কার্ডটি ব্যবহার করে চিকিৎসা, অপারেশন-সহ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সুবিধা পেয়ে থাকেন গ্রাহকরা। বিজেপি সরকার আসার পর জনতার মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এবার স্বাস্থ্যসাথী কার্ড আদৌ কার্যকর হবে কি না। কিন্তু শনিবারের বারবেলায় ঘোষণা করে তাঁদের সকলকে আশ্বস্ত করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেইসঙ্গে তাঁর খোঁচা,আগের সরকারের আমলে কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে কোনও সম্পর্ক ছিল না। এমনকী স্বাস্থ্যের মতো যৌথ ক্ষেত্রে আমলা বা আধিকারিকদের মধ্যে কথাবার্তা, চিঠিপত্র আদানপ্রদানও হয়নি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। এবার সেসব অতীত হতে চলেছে।তিনি জানান, কেন্দ্রের তরফ থেকে বাংলায় ৭ লক্ষ ডোজ টিকা পাঠানো হচ্ছে। বিধানননগর মহকুমা হাসপাতাল থেকে শুরু হবে এই টিকাকরণ কর্মসূচি। ১৪-১৫ বছরের ঊর্ধ্বে যেকোনও কিশোরী টিকাকরণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে। এছাড়া এদিন শুভেন্দু জানান, সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে জনৌষধি কেন্দ্র বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলায় ১১৭টি রয়েছে। তা বাড়িয়ে ৪৬৯টি করা হবে। দুরারোগ্য ব্যাধির ক্ষেত্রে ওষুধে ৫০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যাবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। এছাড়া ন্যাশনাল হেলথ মিশনে ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র। যার মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়া গিয়েছে শনিবার।
মহিলাদের যে যে ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি তার মধ্যে একটি অন্যতম সার্ভাইক্যাল ক্যানসার।সারা বিশ্বে প্রতি বছর নতুন করে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬ লাখ। আর প্রতি বছর ক্যানসারে মৃত্যুহার প্রায় ৩.৪ লাখ। এটি মহিলাদের মধ্যে চতুর্থতম ক্যানসার। আর এদেশের নিরিখে, এটি মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয়তম ক্যানসার। এদেশে প্রতি একলাখে ১৪ জন করে নতুন সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের রোগী প্রতিবছর চিকিৎসা করাতে আসেন, আর মৃত্যুহার লাখে ৯ জন। এদেশের জনসংখ্যার নিরিখে সংখ্যাটা নেহাতই কম নয়। এই ক্যানসার প্রতিহত করতে টিকাকরণের উপর জোর দিয়েছে কেন্দ্র। অর্থাৎ সময়ে টিকা নিয়ে নিলে ক্যানসার প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ প্রতিহত করা সম্ভব।
সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের জন্য মূলত দায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস। এই ভাইরাসের অনেক ধরন রয়েছে। সাধারণত যৌন সংসর্গের মাধ্যমে এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে ও ক্যানসার ডেকে আনে। মূলত যাদের একধিক যৌনসঙ্গী তাদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি। এছাড়াও ওবেসিটি বা অতিরিক্ত মেদ, ধূমপান ও মদ্যপান করার প্রবণতাও এই ক্যানসারের প্রবণতা বাড়ায়। মূলত এই ক্যানসার নির্ণয় হয় অনেক দেরিতে, তখন হয়তো চিকিৎসা করেও ক্যানসার নির্মূল করা যায় না।
এদেশে তথা এ রাজ্যে মহিলাদের মধ্যে অনেক বেশি মাত্রায় এই ধরনের সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেকেই লোকলজ্জায় খোলসা করে যৌনাঙ্গের কোনও সমস্যার কথা পরিবারের কাউকে এমনকী পার্টনারকেও বলতে পারেন না। এড়িয়ে যেতে যেতে বিপদ বাড়ায়, ক্যানসার দেরিতে ধরা পড়ে। তাই অতিরিক্ত সাদাস্রাব, মাসিকের পরও রক্তপাত, মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পরও রক্তক্ষরণ এবং কোমরে ব্যথা হলে সাবধান হওয়া প্রয়োজন বলেই দাবি চিকিৎসকদের।
