
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক:পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে ছোট্ট এক যোগসূত্র। ম্যাপে ইরান ও আরব আমিরশাহির মধ্যে ক্ষুদ্র একটা অংশ। সেটাই গোটা বিশ্বের জ্বালানির মূল ধমনী। আর ইরানে যুদ্ধের আবহে সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরকে জুড়ে দেওয়া ওই ছোট্ট অংশটি নাম হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)। সবচেয়ে সরু যেখানে, সেটির প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। গোটা বিশ্বে জলপথে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে যত তেল আদান-প্রদান হয়, তার ২০ শতাংশ বা তারও বেশি এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। মানবদেহে জুগুলার ভেইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বলা হয়ে থাকে হরমুজ প্রণালীও বিশ্ব অর্থনীতির জুগুলার ভেইন। এখন সেখানেই বিপদে আশঙ্কা, উদ্বেগ রয়েছে ভারতকে নিয়েও। কারণ এবং তার বিস্তারিত ব্যাখায় যাওয়ার আগে এক বার দেখে নেওয়া প্রয়োজন হরমুজ প্রণালী নিয়ে চিন্তা বাড়ছে কেন?
পশ্চিম এশিয়া এখন উত্তপ্ত। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর যৌথভাবে হামলা করে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল (Operation Epic Fury)। সেই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আমি খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের অনেকেই। এই ঘটনার পরে পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করেছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ার কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, আরব আমিরশাহিতে থাকা আমেরিকার সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করে এবং ইজ়রায়েলে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে। পাল্টা ইরানে লাগাতার এয়ারস্ট্রাইক করছে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়ায়। এই আবহেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনওরকম পণ্যবাহী বা তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে সাবধান হতে হবে বলে জানিয়েছে ইরানের IRGC। সরকারি ভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি ইরান, কিন্তু হুমকির আবহে এখান থেকে খুবই কমে গিয়েছে জাহাজ চলাচল। তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। যার ফলে ওই প্রণালী দিয়ে জাহাজ ও ট্যাঙ্কার চলাচল কার্যত বন্ধ। যার ফলে গোটা বিশ্বে তেলের জোগান নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ। এখান থেকে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সারা বিশ্বে যায়। পারস্য উপসাগর হয়ে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে আরব সাগরে পড়ে ট্যাঙ্কারগুলি। তারপরে হয় এশিয়ার দিকে অথবা ইউরোপের দিকে ঘুরে যায়।
আমেরিকার এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (US Energy Information Administration)-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে অন্তত ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বেরিয়েছে। এই পথ দিয়েই রপ্তানি হয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস। সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বের মোট জোগানের অন্তত ২০-৩০ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়। ইউরোপের বিমান জ্বালানির বড় অংশও এই পথ ধরে যায়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরিন, আরব আমিরশাহি এবং ইরানেরও উত্তোলিত তেল ও গ্যাস রপ্তানি করতে এটাই একমাত্র জলপথ। সেখানেই এখন থমকে গিয়েছে সব।
তথ্য বলছে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প প্রায় নেই। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, আরব আমিরশাহির ফুজাইরাহ পাইপলাইন রয়েছে ঠিকই। কিন্তু পরিকাঠামোগত বিচারে সেগুলি পিছিয়ে। হরমুজ প্রণালীতে জলপথে যত তেল ও গ্যাস প্রতিদিন যেতে পারে। এই পাইপলাইন দিয়ে তার ধারেকাছেও পৌঁছনো যাবে না। তাছাড়া যুদ্ধের আবহে এই পাইপলাইনে হামলা হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
CM CGM, Maersk, MSC-এর মতো একাধিক বৃহৎ শিপিং সংস্থা হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ ও ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ রেখেছে। আফ্রিকার কাছ দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে জাহাজ। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, Saudi Aramco হরমুজ এড়াতে লোহিত সাগরের ইয়ানবু পোর্টের উপর ভরসা রাখছে। অ্যারামকোর তরফ থেকে এশিয়ার ক্রেতাদের জানানো হয়েছে, ইয়ানবু থেকে কার্গো তুলতে তারা সক্ষম কিনা। সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে ইয়ানবু দিয়ে রপ্তানির ভাবনা থাকলেও সেটাও পুরোপুরি বিপদমুক্ত নয়। কারণ তার কাছেই রয়েছে ইয়েমেন। ওই দেশ গৃহযুদ্ধে জেরবার। ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী অত্যন্ত শক্তিশালী। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ যাতায়াত থমকে যেতেই গোটা বিশ্বে শকওয়েভ পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে তেলের দাম।
ভারতের ঝুঁকি কোথায়?
জিডিপির হিসাবে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (Purchasing Power Parity) বিচার করলে ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তবুও হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে প্রবল চাপে পড়তে পারে ভারত।
ভারতের যা পেট্রোপণ্য লাগে তার ৮৫%-৮৮% মতো আমদানি করতে হয়। ET-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই আমদানির প্রায় ৫০% আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। অন্যদিকে ভারতের LNG আমদানির অন্তত ৫৪ শতাংশ আসে এই প্রণালী দিয়ে। বাকিটা রাশিয়া এবং অন্যান্য উৎস থেকে আসে। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে ভারতের নিত্যদিনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানিতে টান পড়তে পারে।
জ্বালানির জোগানে সমস্যা হতেই পারে। সেই সমস্যা কতটা কাবু করবে তা অনেকটাই নির্ভর করে ভাঁড়ারের উপর। চিনও তেলের জন্য পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল। ইরান থেকেও ঘুরপথে তেল নেয় চিন। কিন্তু চিনের কাছে অন্তত ৬ মাসের অপরিশোধিত তেল মজুত আছে। বিজ়নেস টুডে-র প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জাপানের কাছে ২৫৪ দিনের মজুত রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে যা মজুত রয়েছে তা চলবে ২০৮ দিন। সেই তুলনায় ভারত অনেক নীচে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি জানিয়েছিলেন, সব উৎস মিলিয়ে ভারতের কাছে ৭৪ দিনের মজুত রয়েছে। পিটিআই প্রতিবেদনে এনার্জি অ্যানালিটিকস ফার্ম Kpler-কে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, ভারতের কাছে মজুত করা তেল দিয়ে ৪০-৪৫ দিন চবে। অন্যদিকে রয়টার্সের এবং দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি সূত্রের মতে ভারতের হাতে ২৫ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। তবে এর মধ্যে স্পেশাল পেট্রোলিয়াম রিজ়ার্ভ বা SRP-র হিসাব ধরা নেই।
তেলের জন্য অল্প হলেও মজুত রয়েছে। কিন্তু চিন্তা বাড়াচ্ছে LNG। ভারতের হাতে এর মজুত আরও কম। এর মধ্যে LNG-এর সবচেয়ে বড় উৎস কাতার যুদ্ধের আবহে LNG উৎপাদন স্থগিত করেছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি বেশিদিন চললে চাপ তৈরি হবে ভারতের গ্যাসের উৎসে। এক সময়ে রাশিয়া ভারতের সস্তার তেলের উৎস ছিল। কিন্তু লাগাতার আমেরিকার ট্যারিফ চাপ হোক বা অন্য কোনও কারণে, সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তেল আনা কমিয়েছে ভারত। বদলে ২০২২ সালের পরে ফের রেকর্ড উচ্চতায় গিয়েছে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল আমদানি। এখন সেই এলাকাতেই সমস্যা হওয়ায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমস্যা কোথায় হবে?
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের অর্থনীতিতে। তেলের আমদানিতে খরচ বাড়লে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে। দেশের মধ্যে তেলের দাম বাড়ালে মূল্যবৃদ্ধি বাড়লে। জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিক ভাবে উৎপাদনের খরচ বাড়বে। এর ফলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আমজনতা- সকলেই প্রবল চাপে পড়বে। তেলের দাম বাড়লে ধাক্কা লাগবে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিতেও।
ভারতের সামনে বিকল্প কী?
আমেরিকা, ব্রাজ়িল, রাশিয়া-সহ অন্য কিছু দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা। এদিকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, বসেছিল ট্যারিফের বোঝা। এখন তেলের জন্য ভারত ট্যারিফ হুমকি সয়েও রাশিয়ার হাত ধরে কিনা তা দেখার বিষয়। কিন্তু জ্বালানির মতো বিষয় চাইলেই উৎস বদলে ফেলা যায় না। তার জন্য দীর্ঘ আলোচনা এবং পরিকাঠামো প্রয়োজন হয়। পারস্য উপসাগর থেকে যত দিনে তেলবাহী জাহাজ এসে ভারতে পৌঁছয়। তার থেকে অনেক বেশি দিন লাগে রাশিয়া বা অন্য দেশ থেকে আনালে। সব মিলিয়ে বিষয়টি সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। যদিও রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই আবহে রাশিয়ার তরফ থেকে ভারতকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। এনার্জি সেক্টরে জোগান নিয়ে সমস্যা হলে ভারতের পাশে দাঁড়াতে তারা প্রস্তুত। জোগান যদি নিশ্চিত না হয় তার মধ্যে পশ্চিম এশিয়া যদি স্বাভাবিক অবস্থায় না ফেরে, তাহলে ভারতে পেট্রোল-ডিজ়েল এবং রান্নার গ্যাসের দাম বাড়বে কিনা, তা নিয়ে আশঙ্কায় বহু সাধারণ মানুষ।
