
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির আবেগ, আনন্দ, উৎসব আর মিলনমেলা। কিন্তু উৎসবের এই রঙিন আবহের আড়ালে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার অসংখ্য মানুষের রুজিরুটির গল্প। পুজোর কয়েকটি দিনকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই কাজের সুযোগ তৈরি হয় লক্ষাধিক মানুষের। ঢাকি থেকে মৃৎশিল্পী, মণ্ডপ নির্মাণের কারিগর থেকে আলোকসজ্জার কর্মী, ফুল বিক্রেতা থেকে শুরু করে অস্থায়ী দোকানদার—শারদোৎসব বহু মানুষের কাছে বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার বহু পরিবারের কাছে এই চার-পাঁচটি দিন সারা বছরের অন্যতম বড় উপার্জনের সুযোগ নিয়ে আসে।
দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় উৎসবের বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই। প্রতিমা তৈরির কাজ থেকে শুরু করে মণ্ডপ নির্মাণ, আলো লাগানো, প্যান্ডেল সাজানো এবং পুজোর আনুষঙ্গিক সামগ্রী তৈরি—সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় অসংখ্য দক্ষ ও অদক্ষ কর্মীর। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মৃৎশিল্পীরাও এই সময়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রতিমা গড়া, মাটির কাজ, রং করা এবং সাজসজ্জার কাজে যুক্ত শিল্পীদের কাছে পুজোর মরসুম তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বছর নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করলেও পুজোর আগে বরাত বাড়ায় তাঁদের উপার্জনের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। একইভাবে দুর্গাপুজোর অবিচ্ছেদ্য অংশ ঢাকের বাদ্যি। পুজোর দিনগুলিতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাক বাজাতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কলকাতা-সহ বড় শহরগুলিতে আসেন ঢাকিরা। অনেকেই দল বেঁধে আসেন, সঙ্গে থাকে পরিবারের অন্য সদস্যরাও। পুজোর কয়েকটি দিনে ঢাক বাজিয়ে যে পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, তা অনেকের কাছেই সংসারের খরচ মেটানোর বড় সহায়। কেউ সেই টাকা দিয়ে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনেন, কেউ আবার সন্তানের পড়াশোনা কিংবা বাড়ির অন্যান্য খরচের জন্য সঞ্চয় করেন। ফলে ঢাকিদের কাছে দুর্গাপুজো শুধু ঐতিহ্য রক্ষার উপলক্ষ নয়, জীবিকা নির্বাহেরও গুরুত্বপূর্ণ সময়।
পুজোর অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন আরও বহু মানুষ। বাঁশ, কাপড়, কাঠ, থার্মোকল ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে মণ্ডপ তৈরির কাজে যুক্ত কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়ে। আলো ও শব্দের ব্যবস্থাপনা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, প্রতিমা পরিবহণ, পুজোর সামগ্রী সরবরাহ এবং মণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্বেও কাজ পান অনেকে। পাশাপাশি ফুল, ফল, ধূপ, প্রদীপ, পুজোর পোশাক ও নানা ধরনের সামগ্রীর বিক্রি বাড়ায় ছোট ব্যবসায়ী এবং হকারদেরও আয় হয়। উৎসবকে ঘিরে খাবারের দোকান, অস্থায়ী স্টল, পরিবহণ পরিষেবা এবং পর্যটন-সংক্রান্ত কাজেও তৈরি হয় বাড়তি কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশেষ করে গ্রামবাংলার বহু কারিগর ও শ্রমজীবী মানুষের কাছে পুজোর মরসুমের গুরুত্ব আলাদা। বছরের অন্য সময়ে নিয়মিত কাজ না থাকলেও উৎসবের আগে অস্থায়ী কাজের সুযোগ তাঁদের হাতে কিছুটা বাড়তি অর্থ তুলে দেয়। তবে এই উপার্জন সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। কাজের বরাত, দক্ষতা, পারিশ্রমিক এবং স্থানীয় চাহিদার উপর নির্ভর করে আয় কমবেশি হয়। তবুও শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই অস্থায়ী কর্মসংস্থান বহু পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় উৎসব বা সাংস্কৃতিক উদ্যাপনেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার বৃহৎ এক কর্মজগতের জীবনযাত্রা। পুজোর আলোয় যখন শহর থেকে গ্রাম সেজে ওঠে, তখন সেই আলোর নেপথ্যে পরিশ্রম করেন অসংখ্য মানুষ। তাঁদের হাতের কাজ, শিল্পকলা এবং শ্রমেই পূর্ণতা পায় শারদোৎসব। তাই পুজোর আনন্দের পাশাপাশি এই মানুষগুলির অবদান ও জীবিকার দিকটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
