
নয়াদিল্লি, ১৩ অক্টোবর : বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের আবহে ভারতে প্রথমবার অনুষ্ঠিত ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য রাখলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রযুক্তি, ডেটা এবং উদ্ভাবনকে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না রেখে সাধারণ কোটি কোটি মানুষের ক্ষমতায়নে ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি। এই উপলক্ষে তিনি ‘পাওয়ার টু এমপাওয়ার’—অর্থাৎ ক্ষমতায়নের জন্য শক্তির সদ্ব্যবহারের নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের কথা তুলে ধরেন।
ভারতে প্রথমবার এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করার জন্য উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী বলেন, "প্রতি বছর এই ফোরাম বিশ্বের সেরা চিন্তাবিদ ও অর্থনীতিবিদদের এক ছাদের তলায় নিয়ে আসে। এবারই প্রথম এই আয়োজন ভারতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের জন্য আমি ব্লুমবার্গ এবং তাদের পুরো টিমকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনারা একদম সঠিক সময়ে এবং সঠিক স্থানটিকেই বেছে নিয়েছেন।"
বর্তমান ডিজিটাল যুগের শক্তি ও তার বণ্টন নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "এখন প্রযুক্তি, ডেটা, জ্ঞান এবং উদ্ভাবন হলো মহাশক্তি। কিন্তু আসল প্রশ্ন এটা নয় যে এই শক্তি কার হাতে রয়েছে; বরং প্রশ্ন হলো, একে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? প্রযুক্তি কি কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি তা কোটি কোটি মানুষের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে? জ্ঞান কি কেবল কয়েকজন ব্যক্তির শক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি তা প্রত্যেকের সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে? এখান থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন ভাবনা—'পাওয়ার টু এমপাওয়ার'।"
ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও জ্ঞানের সদ্ব্যবহারের দর্শন ব্যাখ্যা করে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী বলেন, "জ্ঞান, সম্পদ এবং ক্ষমতা যাঁর হাতেই থাকুক না কেন, তিনি সেগুলির কী ব্যবহার করছেন—তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার আসল সার্থকতা নিহিত থাকে তার উদ্দেশ্যের মধ্যে, এবং বর্তমান সময়ে এই দর্শনটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।।আমাদের হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য আমাদের এই শিক্ষাই দিয়েছে। ভারতে আমরা আমাদের শাসনব্যবস্থা ও কর্মসংস্কৃতিতে এই দর্শনের সফল প্রয়োগ করে দেখিয়েছি।"
নাগরিক ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, "সরকারের কাছে কর্তৃত্ব থাকে, কিন্তু সেই ক্ষমতার উদ্দেশ্য কখনই নাগরিকদের ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হওয়া উচিত নয়। বরং সরকারের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নাগরিকদের শক্তিশালী ও সক্ষম করে তোলা—এবং ভারত আজ দৃঢ়ভাবে সেই পথেই এগোচ্ছে। এই নীতি অনুসরণ করেই ভারত গত দশ বছরে ২৫ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে, যা বিশ্বের বহু দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।"
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে ভারতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "ভারতে 'এআই ইমপ্যাক্ট সামিট' অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার ভূয়সী প্রশংসা করেছিল স্বয়ং ব্লুমবার্গও। সেই সম্মেলনে মানবতার স্বার্থে এআই-এর ব্যবহারের পাশাপাশি পশুপাখি ও প্রাণীজগতের কল্যাণে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়েছে। এই দূরদৃষ্টিই প্রমাণ করে যে ভারত যত বেশি সক্ষম ও আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে, বিশ্ব ও সমগ্র মানবজাতির জন্য তা ততটাই কল্যাণকর হবে।"
দেশের আর্থিক শক্তি ও সংস্কারের গতি প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, "আজ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। বহু দেশের তুলনায় ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এই শক্তির জেরেই ভারতের সার্বভৌম রেটিং ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে। বর্তমানে ভারতের আত্মবিশ্বাস এক নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমাদের 'সংস্কার এক্সপ্রেস' দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। আমাদের জন্য সংস্কার কোনও বাধ্যবাধকতা নয়, সংস্কার আমাদের অন্তরের প্রত্যয়।"
বিশ্বকল্যাণে ভারতের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, "বিশ্বের যখনই কোনো শক্ত স্তম্ভের প্রয়োজন হয়, ভারত নিজের দায়িত্ব অনুধাবন করে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। আমরা কারও বিনিময়ে বা কারও ক্ষতি করে এগোই না; আমরা বিশ্বের সঙ্গে এবং সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য একসঙ্গে এগিয়ে চলি। আর ভারত যা করে, তার জন্য কখনও আলাদা করে কৃতিত্ব দাবি করে না।"
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের গৃহীত উদ্যোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, "ইতিহাস জুড়ে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে উঠেছে, যার প্রতিটির নিজস্ব কিছু সুবিধা ছিল। কিন্তু ভারত এমন বৈশ্বিক মঞ্চ তৈরি করেছে—যেমন ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স কিংবা কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার অর্থাৎ, ভারত এমন সব উদ্যোগ নিয়েছে যা প্রতিটি মানুষ এবং প্রতিটি প্রাণের কল্যাণে কাজে আসে।"
The greatest power is the power to empower! https://t.co/zG16Kh6G4b
— Narendra Modi (@narendramodi) October 13, 2026
