
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: শ্যামাপ্রসাদের আশীর্বাদেই এই জয়: কনভেনশন সেন্টারে আবেগঘন অমিত শাহ। ৪ মে বাংলার বুকে যে রাজনৈতিক সুনামি দেখা গেছে, তাকে ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মার শান্তি হিসেবে দেখছে বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব। শুক্রবার নিউ টাউনের অনুষ্ঠানে অমিত শাহ বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে অঙ্গীকার করেছিলেন, আজ তা পূর্ণ হলো। জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা আজ স্বর্গ থেকে মোদিজিকে আশীর্বাদ করছেন।' তাঁর মতে, কয়েক দশকের বাম ও তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০৭টি আসনের এই জয় আসলে বাংলার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের সূচনা। শাহর চোখেমুখে এদিন দীর্ঘ কয়েক বছরের পরিশ্রমের সার্থকতা স্পষ্ট ধরা পড়েছে।
১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জনসংঘ। সেটাই আজকের বিজেপির ভিত্তিপ্রস্তর। আর তাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বলা হয় ‘বিজেপির জনক’। সেই মানুষটির স্বপ্নই যেন পূরণ করলেন মোদি-শাহ। যাঁর প্রধান স্বপ্ন ছিল ‘এক দেশ, এক নিশান, এক বিধান’। সেই স্বপ্ন অবশ্য আগেই পূরণ হয়েছিল। ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বাতিল হয়। জম্মু ও কাশ্মীর হয়ে যায় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। যা ছিল শ্যামাপ্রসাদের স্বপ্ন। তিনি বারবার বলেছিলেন ওই ধারা বজায় রাখলে ভবিষ্যতে আরও সমস্যা বাড়বে। এখানেই শেষ নয়। শেষপর্যন্ত কাশ্মীরে অভিযান করেন তিনি। ৩৭০ ধারা বিলোপ ও পারমিটরাজ বাতিলের দাবিতে ১৯৫৩ সালের ১১ মে পাঞ্জাবের উধমপুরে সভা করার পর তিনি কাশ্মীরের উদ্দেশে রওনা হন। এরপরই তাঁর গ্রেপ্তারি। এবং ২৩ জুন রহস্যমৃত্যু। এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্বও রয়েছে, সেই মৃত্যুর নেপথ্যে নাকি কংগ্রেসের ‘হাত’ রয়েছে। বলাই বাহুল্য, এই রহস্যের সমাধান আজও হয়নি।
১৯৫০ সালে নেহরুর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। তারপরই জন্ম ভারতীয় জনসংঘের। ১৯৫২ সালের মে মাসে লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন তিনি। এত বছর পেরিয়ে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেন সেদিনের সেই জয়ের এক সুবৃহৎ সম্প্রসারণ। দীর্ঘ সময় বঙ্গ রাজনীতিতে বিজেপি প্রবেশ করতে পারেনি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা পেয়েছিল মাত্র তিনটি আসন। ২০১৯ লোকসভায় ১৮টি আসনপ্রাপ্তিই এরাজ্যে বিজেপির প্রকৃত অভ্যুত্থান। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসন। আর এবার ২০৭টি আসন। অঙ্গ, কলিঙ্গের পর বঙ্গে জয়। আর এই জয়ের নেপথ্যে রয়ে গিয়েছে শ্যামাপূরণের স্বপ্ন। নিঃসন্দেহে সেই স্বপ্নপূরণ হল মোদি-শাহর হাত ধরে।

তিনি বলে গেলেন, “দেশের সুরক্ষার সঙ্গে কোনওরকম আপস নয়। প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বের করা হবে।”অমিত শাহ সাফ বলে দিলেন, যে সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বাংলায় তাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন, সেই সোনার বাংলায় অনুপ্রবেশকারীদের কোনও ঠাঁই নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, “বাংলার মানুষকে আমি কথা দিচ্ছি আগামী পাঁচ বছরে দেশ থেকে খুঁজে বের করে করে তাড়াব।”
অনুপ্রবেশ বাংলার দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিজেপির দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, রাজ্যের তৃণমূলের ছত্রছায়াতেই অনুপ্রবেশকারীদের উৎপাত বেড়েছে বঙ্গে। পালটা তৃণমূলের দাবি ছিল, সীমান্তরক্ষায় বিএসএফের ব্যর্থতাই অনুপ্রবেশের কারণ। সমস্যা হল, ওই অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্তে রুখে দেওয়ার জন্য সীমান্ত সিল হওয়া জরুরি। কিন্তু এতদিন জমি সমস্যায় সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস, “এবার বাংলার সীমান্ত সিল হবেই। সব অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বের করে তাড়ানো হবে।”
শাহের কথায়, জাতীয় সুরক্ষার সঙ্গে কোনওরকম আপস নয়। অনেকে অভিযোগ করেন, বিজেপি এই অনুপ্রবেশকারী ইস্যুটা তোলে শুধু মেরুকরণের জন্য। কিন্তু সেটা সত্যি নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, “মেরুকরণ নয়, বিজেপি এই অনুপ্রবেশকারীদের কথা বলে শুধু জাতীয় সুরক্ষার জন্য। জাতীয় সুরক্ষায় কোনও আপস করা হবে না।” শাহের সাফ কথা, অনুপ্রবেশকারীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে থাকতে দেব না বাংলাকে।
শুক্রবার বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টার থেকে তাঁর নাম ঘোষণা করেন অমিত শাহ (Amit Shah)। নিজের নাম শুনে চোখ ছলছল হয়ে ওঠে শুভেন্দুর। ঘোষণার পর বঙ্গবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দুর লড়াইকে কুর্নিশ জানালেন শাহ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘ভবানীপুরবাসীকে আমার বিশেষ ধন্যবাদ এখান থেকে শুভেন্দুদাকে বিজয়ী করার জন্য। মমতাজি, আপনি তো বলতেন যে ভবানীপুরের ঘরের মেয়ে আপনি। মনে রাখুন, আপনার ঘরে ঢুকেই শুভেন্দুদা আপনাকে হারিয়েছেন।” উল্লেখ্য, ভবানীপুরের মতো হাইভোল্টেজ কেন্দ্র থেকে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছেন শুভেন্দু অধিকারী।

বছর ছয়েক আগে অমিত শাহর হাত ধরেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। নিজের উজ্জ্বল রাজনৈতিক কেরিয়ারের কারণে সেই থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন। একুশ এবং ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে বাংলার মাটিতে পদ্ম ফুটিয়ে তোলার গুরুভার তাঁকেই দিয়েছিল দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্ব। একুশে সফল না হলেও ছাব্বিশে কার্যত গেরুয়া সুনামি হয়েছে রাজ্যে। একুশে বাংলায় ৭৭ জন বিধায়ক সংখ্যা ছাব্বিশে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৭-এ। এত লড়াইয়ের পুরস্কার হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীকে।
শুক্রবার সেই ঘোষণা করতে গিয়ে শুভেন্দুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন অমিত শাহ। বললেন, ‘‘শুভেন্দুদা অত্যন্ত কঠিন লড়াই করেছেন। নন্দীগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে ভবানীপুর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড় থেকে তাঁকে হারিয়েছেন। আমি শুভেন্দুদাকে অনেকদিন ধরে চিনি। তৃণমূলে থাকার সময় থেকে তাঁকে জানি। আমরা মনে করি, বাংলায় সুশাসন এবং জনতার সুরক্ষা দিতে তিনিই যোগ্যতম ব্যক্তি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি ছাড়া কারও নামই কেউ প্রস্তাব করেনি। আগামী ৫ বছর তিনি বাংলার জনগণের জন্য ভালোভাবে কাজ করবেন এবং নতুন বাংলা গড়বেন।”
