
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: দুর্গাপুজোর মরসুমে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বামপন্থীদের বইয়ের স্টলে হামলার ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বেড়েছে। রবিবার সেই হামলার পক্ষে সওয়াল করতে দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। একইসঙ্গে বামপন্থী ও তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থানকে নিশানা করে তীব্র আক্রমণ শানান তিনি। বিরোধী মতাদর্শের সমালোচনা করতে গিয়ে বাম ও তৃণমূলকে ‘ছারপোকা’, ‘আরশোলা’, ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ এবং ‘দিমাগী নকশাল’ বলেও কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূলকে ‘জামাতি’ বলেও আক্রমণ শানান তিনি। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন দুর্গাপুজোর মধ্যে রাজ্যের একাধিক এলাকায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টলে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বারাসত, নাগেরবাজার, জোড়াবাগান, যাদবপুর, এন্টালি ও কসবা-সহ কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগের তির ছিল সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত দুষ্কৃতীদের দিকে। এই ঘটনার নিন্দা করেছিলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং আরএসএসের জিষ্ণু বসুও।
রবিবার অবশ্য বইয়ের স্টল ঘিরে বিতর্কে অন্য অবস্থান নেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে কাউকে দেশবিরোধী বা সনাতনবিরোধী লেখা প্রকাশ করতে দেওয়া হবে না। কোনও ধর্মের ভাবাবেগেও আঘাত করতে দেওয়া হবে না।” তাঁর দাবি, বইয়ের স্টল বসানোর যে চেষ্টা হয়েছিল, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর কথায়, মানুষই ওই স্টল বসানোর উদ্যোগে বাধা দিয়েছেন। বিরোধী মতাদর্শের মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষেও সওয়াল করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব গড়ে তুলতে প্রতি বছর অন্তত তিন দিন বিতর্ক, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং তাৎক্ষণিক বক্তৃতার মতো অনুষ্ঠান আয়োজন করা উচিত। পাশাপাশি আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে একাধিক পরিবর্তন দেখা যাবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। বাম ও তৃণমূল দুই সরকারের বিরুদ্ধেও তীব্র আক্রমণ শানান শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, ৩৪ বছরের বাম শাসন এবং ১৫ বছরের তৃণমূল শাসন বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেছে। এই দুই শাসনকালে রাজ্যের মানুষের পরম্পরা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছে বিরোধী শিবির। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী তাঁর ‘সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ’-এর দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, বইয়ের স্টল ভাঙতে বুলডোজার এবং পুরসভার আবর্জনা সরানোর গাড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল। বই সরিয়ে স্টল ভেঙে ফেলার সেই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেই সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। যাদবপুরে সিপিএমের একটি বইয়ের স্টল বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার চেষ্টা প্রতিহত করতে রাতভর পাহারা দিয়েছিলেন বাম কর্মী, বইপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষ। সুজন চক্রবর্তীর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী নিজেও অতীতে কংগ্রেস ও তৃণমূলের মতো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, অথচ এখন সেই দলগুলির মানসিকতা নিয়ে আক্রমণ করছেন।
তৃণমূল নেতা তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বক্তব্য পছন্দ না হলেই কি কেউ হামলা চালাতে পারেন? পুলিশ কি নীরব দর্শক হয়ে থাকবে এবং মুখ্যমন্ত্রীর আসন থেকে সেই হামলাকে সমর্থন করা হবে? সিপিএমের সঙ্গে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও তাদের বই বিক্রির অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সঙ্গে এই ধরনের আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও দাবি করেন কুণাল।
এদিকে, বইয়ের স্টলে হামলার ঘটনায় আগে নিন্দা জানিয়েছিলেন আরএসএসের পূর্বাঞ্চলের প্রচার ও জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত জিষ্ণু বসু। ক্ষমতার দম্ভে এমন হামলাকে তিনি কাপুরুষোচিত বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে রবিবার তাঁর বক্তব্যে অন্য সুর শোনা যায়। সামাজিক মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন, এ ধরনের হামলা বামপন্থীদের রাজনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় তাদের আরও বড় করে তুলে ধরতে পারে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ছোট প্রতিপক্ষকে অযথা বড় করে দেখানোর প্রয়োজন নেই।
কংগ্রেসও মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনায় সরব হয়েছে। অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সদস্য সৌম্য আইচ রায় দাবি করেন, কর্মসংস্থান, বাসস্থান, জীবিকা, আইনশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার মতো প্রতিশ্রুতি পূরণে মুখ্যমন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন। মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতেই বইয়ের স্টল ভাঙার মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আরও দাবি, উদার চিন্তাভাবনা, ভিন্নমত এবং বৈচিত্র্যকে সহ্য করতে না পারা ফ্যাসিবাদী মানসিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গেরুয়া শিবিরের মধ্যেও বইয়ের স্টলে হামলা নিয়ে মতপার্থক্য সামনে এসেছে বলে মন্তব্য করেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর বক্তব্য, প্রকাশ্যে নিন্দা এবং অন্যদিকে হামলার পক্ষে সওয়াল এই দুই অবস্থানের মাধ্যমে মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে, বামেদের বইয়ের স্টলে হামলা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে।
