
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার মানুষের মন জয়ে নবান্নের তুরুপের তাস এখন ‘আবাস’ ও ‘পথশ্রী’। ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই যাতে গ্রামগঞ্জে নতুন পাকা বাড়ির ছাদ আর ঝকঝকে রাস্তা তৈরি হয়ে যায়, তার জন্য নবান্ন থেকে জেলাস্তরের আধিকারিকদের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি তৃণমূলের সংগঠন ও আইপ্যাকের কৌশলী ভূমিকা কাজ করছে। ভোটের ময়দানে যাওয়ার আগে এই পরিষেবামূলক বিষয়গুলিকেই প্রধান হাতিয়ার করতে চাইছে ঘাসফুল শিবির।
তৃণমূলের সর্বোচ্চ স্তরের নেতৃত্ব বিশ্বাস করেন রাস্তা, পানীয় জল, আলো সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা। তার পরে বাকি সব কিছু। সেই সূত্রেই মাথার উপর পাকা ছাদ আর দোরগোড়ায় রাস্তা নির্মাণকে ভোটের আগে তুলে ধরতে ময়দানে নেমে পড়েছে সব জেলা প্রশাসন। শাসকদলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘এই পথেই গত লোকসভা ভোটে বিজেপির মেরুকরণকে ভোঁতা করা গিয়েছিল।’’ এ বারও তা যাবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য নানা মহলে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, লোকসভা ভোটের পরবর্তী সময়ে পরিপার্শ্ব বদলেছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকেও আলোড়িত করছে। আরজি কর পর্বে ক্ষোভের গণবিস্ফোরণ দেখেছিল রাজ্য। তবে তা সত্ত্বেও পুরনো পথেই নতুন ভোটের দিকে যেতে চাইছে তৃণমূল।
আগের দফায় ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে ১২ লক্ষ পরিবারকে অর্থ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। বিধানসভা ভোটের আগে আরও ১৬ লক্ষ পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে আবাসের প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার বলেন, ‘‘এখনও তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। তবে জানুয়ারি মাসেই আবাসের প্রথম কিস্তির অর্থ উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি পৌঁছে যাবে।’’ অর্থাৎ, দু’দফা মিলিয়ে ২৮ লক্ষ পরিবার পাকা বাড়ি তৈরির টাকা পাচ্ছে। ১২ লক্ষ পরিবার দুই কিস্তিই পেয়ে গিয়েছে। ১৬ লক্ষ পরিবার ভোটের আগে পেতে চলেছে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা।
শাসকদলের আশা, অর্থনৈতিক ভাবে প্রান্তিক অংশের যে ২৮ লক্ষ পরিবার মাথায় পাকা ছাদ পাচ্ছে বা পেয়েছে, তার প্রভাব ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হবে। গড়ে প্রতিটি পরিবারে চার জন করে থাকলে সার্বিক ভাবে সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে সওয়া ১ কোটি। তবে সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন যুক্তিও রয়েছে। পঞ্চায়েত দফতরের এক আমলার বক্তব্য, প্রতি পরিবারের সকলেই ভোটার হবেন তা নয়। ফলে সংখ্যাটা ১ কোটির নীচে থাকবে।
বাড়ির পাশাপাশি দোরগোড়ায় ঝকঝকে রাস্তা যাতে সাধারণ মানুষ চাক্ষুষ করতে পারেন, তার জন্যেও জোড়া কর্মসূচি চালাচ্ছে নবান্ন।‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পে বুথপিছু ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। যে প্রকল্পে একেবারে পাড়ার রাস্তা, সৌরবাতি, ছোট সেতু নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, বড় রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ‘পথশ্রী-৪’ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পে সারা রাজ্যে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে।
এই তিনটি কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রশাসনে যেমন ‘তৎপরতা’ রয়েছে, তেমন স্থানীয় স্তরে জনপ্রতিনিধিদেরও ‘সতর্ক ও সক্রিয়’ থাকার বার্তা দিয়েছে তৃণমূল। সন্দেহ নেই, পঞ্চায়েত এবং পুরসভা স্তরে ষোলো আনার মধ্যে চোদ্দো আনা জনপ্রতিনিধিই তৃণমূলের। যা সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে নবান্নের ভরসা। সমান্তরাল ভাবে রাজনৈতিক প্রচারও চালাচ্ছে শাসকদল। যার মূল অভিমুখ, কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ দেওয়া বন্ধ করলেও রাজ্য সরকার থেমে নেই। সরকার নিজের কোষাগার থেকে অর্থ দিয়ে এই কাজ করছে। তৃণমূলের কথায়, ‘মোদী নিচ্ছে, দিদি দিচ্ছে’। উল্লেখ্য, গত চার-পাঁচ বছর ধরে যে যে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যের বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ গোটা তৃণমূল সরব, তার মধ্যে অন্যতম আবাস যোজনা এবং গ্রামসড়ক যোজনা।
ইতিমধ্যেই তাঁর সরকার দেড় দশকে কী কাজ করেছে তার খতিয়ান হিসাবে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। পাঁচালির গানটি গেয়েছেন ইমন চক্রবর্তী। সেই পাঁচালি প্রচারে বক্স বাজিয়ে পড়ায় পড়ায় ঘুরছে তৃণমূলের মহিলাবাহিনী। চাটাই পেতে এক জায়গায় গোল করে মহিলাদের বসিয়ে বসে পাঁচালি শোনানো হচ্ছে। যেখানে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’। সেই প্রচার ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, তার তদারকি করছে আইপ্যাকের টিম। তৃণমূলের মতো সমান্তরাল বাহিনী নামিয়েছে পরামর্শদাতা সংস্থাও। গ্রামাঞ্চলে গ্রাম পঞ্চায়েত ভিত্তিক প্রচারে নজরদারি চালাচ্ছে তারা।
