
কলকাতা, ৭ সেপ্টেম্বর : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৬৭ ভোটে পাশ ১ বৈশাখ বাংলা দিবস পালনের প্রস্তাব । এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়েছে ৬২ টি । বাংলার মাটি বাংলার জল গানটিকে রাজ্য গান গাওয়ার প্রস্তাবও পাশ হয় ভোটাভুটিতে । বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বক্তব্য রাখার পরই বিল পাশ বলে ঘোষণা করলেন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিনের ভোটাভুটিতে অনুপস্থিত ছিলেন একজন ।
পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বাংলা দিবস ও রাজ্য সঙ্গীত নিয়ে প্রস্তাব আনা হল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। বৃহস্পতিবার তৃণমূল পরিষদীয় দলের তরফে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিধানসভায়। বাংলা দিবস নিয়ে প্রস্তাব পড়েন শোভনদেব। প্রস্তাবক হিসাবে নাম রয়েছে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, ব্রাত্য বসু, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, সুশীল সাহা, বিরবাহা হাঁসদা, সত্যজিৎ বর্মণ, কালীপদ মণ্ডল, বিশ্বজিৎ দাস এবং কৃষ্ণ কল্যাণীর। ১ বৈশাখকে বাংলা দিবস করার পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে ওই প্রস্তাবে। এর পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গানটিকে রাজ্য সঙ্গীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এদিন এই প্রস্তাব পেশের সময় অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীও ।
দিনের সভায় শুভেন্দুদের উদ্দেশে গেঞ্জি পরে আসা নিয়ে হাউসের রুল পড়ে শোনালেন স্পিকার। এরপর বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ বক্তব্য রাখতে ওঠেন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ দিবস ২০ জুন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনের সঙ্গে রাজ্য প্রতিষ্ঠার কী সম্পর্ক?, প্রশ্ন শঙ্করের।তিনি বলেন, শ্যামাপ্রসাদ উপলব্ধি করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের কী অবস্থা হতে পারে ৫০ বছর পর। তাই তাঁর ঠিক করে যাওয়া দিন ২০ জুনকেই পশ্চিমবঙ্গ দিবস বলে মানি। এই তারিখকে দুঃখজনক ঘটনার স্মৃতি বলা হচ্ছে। ১ বৈশাখ কেন হবে?
এদিনের সভায় ১৬ অক্টোবর বাংলার প্রতিষ্ঠা দিবস রাখার প্রস্তাব দেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি । তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই বাংলা দিবস উদযাপন করলে কি ডিএ মিলবে? বাংলার দিবস হলেই কি দুর্নীতি ঘুচে যাবে ।
বিধানসভার বিরোধী দল নেতা শুভেন্দু অধিকারী বনে, ২০ জুন রাজভবন পালন করেছেন। তাই কি বিরোধিতা করতেই হবে। আমার অনুরোধ সাংবিধানিক প্রধানের মতকে মেনে নিক রাজ্য সরকার। শুভেন্দু বলেন, আপনাদের শাসকদল যদি ২ কোটি ৮০ লক্ষের জনাদেশ পেয়ে থাকে। আমরাও ২ কোটি ২৮ লক্ষের জনাদেশ পেয়ে এখানে এসেছি। কারও দয়ার দানে আসিনি। এই প্রস্তাবকে আপনারা পাশ করাবেন। আপনাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। এর পরিণতি হবে, বঙ্গ নামের মতো। এর পরিণতি হবে বিধান পরিষদের মতো। এই প্রস্তাবের পরিণতি হবে, মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য করার মতো। এই প্রস্তাবের পরিণতি হবে, বিএসএফের বিরুদ্ধে নেওয়া রেজুলেশনের মতো। এই প্রস্তাবের পরিণতি হবে, ইডি-সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে নেওয়া রেজুলেশনের মতো। সবাই জানে, ১৯৪৭-এর ২০ জুন (নথি তুলে ধরে) পশ্চিমবঙ্গ ভারতবর্ষে থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এই দিনকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। এই রেকর্ড আপনি নষ্ট করতে পারবেন না। দিনটা গ্রহণ করতে আপত্তি কোথায়? প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দল নেতা ।
এদিন তিনি আরও বলেন, ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস প্রমাণিত সত্য। রেজলিউশন নিয়ে এর পরিবর্তন করতে পারবেন না। আমরা জানি এখানে আপনারা কী করবেন। ভোট করবেন। আমরা বিরুদ্ধে ভোট দেবো সেটাও আপনার উপরে। আপনি আবার ভয়েস ভোটও করিয়ে দিতে পারেন। আপনার উপরে। তার পর রাজভবনে যাচ্ছি দল বেধে। যাতে এই রেজলিউশনটায় রাজ্যপাল অনুমোদন না দেন। আজকেই যাব।
নিজের বক্তব্য শুভেন্দু অধিকারীর রাজ্যপাল যাতে বিলে সই না করেন প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পালটা হুঁশিয়ারি দেন । তিনি বলেন, ”রাজ্যপাল সই না করলেও আমরা ওই দিনটিতেই বাংলা দিবস হিসেবে পালন করব।” এনিয়ে দীর্ঘ ইতিহাসের কথাও বিস্তারিত তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ”১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলায় রাজ্যই প্রতিষ্ঠা হয়নি। কোনও মর্যাদাকর ঘটনা ঘটেনি। অনেক পুরনো রাজ্য বাংলা। ব্রিটিশরা যাওয়ার আগে দুটো ভাগে ভেঙে দিয়ে যায়। লক্ষ বাঙালি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মূল পশ্চিমবঙ্গ তৈরি হয় ১৫ আগস্ট। পরে আরও অংশ জুড়েছে। আমাদের কাছে অনেক পরামর্শ এসেছিল। ইমাম, রাজবংশী, তপশিলি, হিন্দি, উর্দুভাষী, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান ক্লাব এসেছিল। অনেক পরামর্শ এসেছে। রাখির দিনের কথা বলেছেন কেউ কেউ। হিন্দু মহাসভাও এসেছিল। ৯৯ শতাংশ লোক বলেছে, পয়লা বৈশাখ দিনটিই পালিত হোক।”
তিনি আরও বলেন, কিন্তু এমন একটা দিন করা উচিত যেই দিনটা বাংলার সঙ্গে লেগে আছে। তাঁর কথায়, ”বাংলার ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন ১ বৈশাখ। বাঙালি শুভ কাজের সূচনা করে এই দিন। সেই দিনটা আমরা বাংলা রাজ্যের প্রতিষ্ঠার দিবস করতে চাই। আর ‘বাংলার মাটি বাংলা জল’কে ‘রাজ্য সংগীত’ করতে চাই। একটা রাজনৈতিক দল আছে, তাঁরা আগেই বলে গেলেন যে তাঁরা রাজভবন যাবেন। যাতে সই না করেন। না করতে পারেন। কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেবেন না। কে সমর্থন করল, না করল কিছু যায় আসে না। আমাদের নির্দেশ থাকবে, ১ বৈশাখ আমরা রাজ্য দিবস পালন করব। আর ওই গানটিকে আমরা রাজ্য গান করব। বাংলার জয়গান গাও। মাটির জয়গান গাও।”
এদিন বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশানা করে মমতা আরও বলেন, "কেন্দ্র সরকার বিজ্ঞপ্তি দেয় বটে। কিন্তু এত বছরে আগে কখনও পালন করা হয়নি। ২০ জুন দিনটির সঙ্গে বাংলার কোনও সম্পর্ক নেই। ওই বিধ্বংসী দিনটি ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলার মানুষের কাছে কখনও গৃহীত হবে না। একটি দলের ইচ্ছে অনুযায়ী সব হবে, যা চাপিয়ে দেবে, মেনে নিতে হবে, এটা হতে পারে না।"
এর পরই ভোটাভুটি হলে, প্রস্তাবের সপক্ষে বেশি ভোট পড়ে। বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় বক্তব্য রাখার পরই প্রস্তাব পাশ বলে ঘোষণা করলেন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন ১৬৭-৬২ ভোটে প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি ভোটপ্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ ‘বাংলা দিবস’ পালিত হবে বলে প্রস্তাব পাশ হয়। শাসকদলের বিধায়করা বিধানসভাতে 'বাংলার মাটি, বাংলার জল' গেয়ে ওঠেন সমস্বরে। 'জয় বাংলা' ধ্বনিও ওঠে।
তবে প্রস্তাব পাস হলেও, তাতে রাজ্যপালের সই প্রয়োজন। রাজ্যপালকে সই করতে দেবেন না, আগের বিলগুলির মতোই অবস্থা হবে এই প্রস্তাবের, এই মর্মে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন শুভেন্দু। তাই বিষয়টি নিয়ে ফের রাজ্য-রাজভবন সংঘাত দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে রাজনৈতিক মহল।
