
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যজুড়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব বিরোধীরা। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে দলের একাধিক নেতা ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের সম্পত্তি বৃদ্ধি নিয়েও বারবার প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তকারী সংস্থার অভিযানে অনেকের কাছ থেকে বিপুল সম্পত্তি, নগদ টাকা, ব্যাঙ্ক আমানত, সোনা-সহ নানা মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে। এই রাজনৈতিক আবহের মধ্যেই সোমবার বিধানসভায় পেশ হল গুরুত্বপূর্ণ ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। সাধারণভাবে যা ‘গুন্ডাদমন বিল’ নামে পরিচিত। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ রুখতেই এই বিল আনা হয়েছে বলে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। বিধানসভায় বিলটি পেশ করেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা।
এই বিলের সপক্ষে বিধানসভায় শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক তথা পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলেন, “যাঁরা মনে করেন সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা কোনও অপরাধই নয়, তাদের ভুল ভাঙার সময় এসেছে। ১৫ বছর ধরে লুট, সন্ত্রাস, রাহাজানি হয়েছে। সিএএ, ওয়াকঅফের নামে বাংলায় নৈরাজ্য হয়েছে। এরাজ্যের শাসকদল শাহাজাহানদের মতো গুণ্ডাদের পুষত। কোটি কোটি টাকার বিছানায় ঘুমোতেন তৃণমূলের নেতারা। গরিবের টাকা যাঁরা শোষণের চেষ্টা করবেন, তাঁদের শাস্তি দেওয়ার জন্যই এই বিল অত্যন্ত দরকার। সরকারি সম্পত্তির দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না আর। আমরা এমনই ব্যবস্থা করছি। এই বিলের মাধ্যমে পুলিশকে টেবিলের তলা থেকে বের করে গুন্ডাদের টেবিলের তলায় ঢোকানোর সময় এসেছে।”
এই বিলের বিরোধিতায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বক্তব্য শুরু করতেই বিধানসভা কক্ষে হট্টগোল শুরু। বলে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক। স্পিকারের কাছে অভিযোগ করে তিনি বক্তব্য না রেখেই বসে পড়েন। বিলের কথা কিছু উচ্চারণ না করেই বিরোধী দলনেতার পদে কেন ঋতব্রতর নাম, তা নিয়ে স্পিকারের কাছে অভিযোগ করতে শোনা যায় শোভনদেবকে। এরপরই বলতে ওঠেন আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক তথা পুর মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। গুন্ডাদমন বিলের স্বপক্ষে তিনি বলেন, “তৃণমূল জমানায় মানুষ দেওয়ালে পেরেক পুঁততে পর্যন্ত ভয় পেত। গত সরকারের বিরোধিতায় অগ্নিমিত্রার বক্তব্য, “যে সরকার ভোট পরবর্তী হিংসা অপরাধ নয়, যে দলের নেতার গাড়ির বনেটে দাঁড়িয়ে ডিজে বাজানোর হুমকি দেয়। তাঁদের হাতে বাংলার শাসনের দায়িত্ব ছিল। এ যেন ঠিক বিড়ালকে মাছ পাহারা দেওয়ার মতো ঘটনা।” উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, উস্কানিমূলক মন্তব্য করলেও তাও গুন্ডাদমন বিলের আওতায় আসবে। বিধানসভায় স্পষ্ট করলেন অগ্নিমিত্রা।
এই বিল পেশ হতেই বিরোধিতা করেন ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। পুলিশের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নওশাদ। তিনি বলেন, “বিলে বলা হচ্ছে সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিরোধীরা মত প্রকাশ করলে সন্দেহ করা হবে না তো? সত্যি সত্যি যাঁরা দোষী, তাঁদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়া হোক। নির্দোষরা যাতে কোনওভাবেই এর জন্য ভুক্তভোগী না হয়।”
সোমবার বিধানসভায় এই বিল পাস করিয়ে লুটের সম্পত্তি উদ্ধার করাও সরকারের লক্ষ্য বলে জানা গিয়েছে। বিলের খসড়ায় বলা হয়েছে, কমিশন চাইলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণের চেয়েও দ্বিগুণ ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ’ বা জরিমানা চাপাতে পারে। এখানেই শেষ নয়, বর্তমানে যে আইন রয়েছে তা অন্তত এই বাংলায় আইনের শাসন কায়েম করে রাখার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বিলে পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থাকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কারণ তৃণমূল জমানায় তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, গুন্ডামি যে চরম মাত্রায় পৌঁছেছিল তা ঠাণ্ডা করতে বাড়তি দাওয়াই দরকার। প্রস্তাবিত নতুন বিল হল সেই দাওয়াই।
বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে বা মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে, এমন সব কাজই সমাজবিরোধী কাজের সংজ্ঞার মধ্যে আনা যাবে। এর মধ্যে রাখা হয়েছে-শৃঙ্খলা নষ্ট করা, মানুষের জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করা, আইনসম্মত ব্যবসা-বাণিজ্য বা পেশায় বাধা দেওয়া, বেআইনি ভাবে কারও স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দখল করা, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করা, খনি, বালি, পাথর বা প্রাকৃতিক সম্পদ বেআইনি ভাবে উত্তোলন করা, বন্যপ্রাণী বা বনজ সম্পদের ক্ষতি করা। অর্থাৎ, শুধু রাজনৈতিক হিংসা নয়, তোলাবাজি, জমি দখল, সিন্ডিকেট, বেআইনি খনি বা বালি কারবার, সম্পত্তি ভাঙচুর, ব্যবসায় বাধা—সবকিছুকেই এই আইনের আওতায় আনার রাস্তা খুলে রাখা হয়েছে।
