
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: একসময় পুরভোটের আগে তৃণমূলের টিকিট পাওয়ার আশায় দলের নেতা-নেত্রীদের বাড়িতে নিয়মিত ভিড় জমাতেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই এবার কার্যত উল্টো পথে হাঁটছেন। কেউ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণ দেখিয়ে নির্বাচনে লড়তে অনীহা প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ শাসকদল বিজেপির টিকিট পাওয়ার আশায় গোপনে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ রাখছেন বলেও অভিযোগ উঠছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পুরভোটে জয়ী তৃণমূলের ১৩৭ জন প্রাক্তন কাউন্সিলরের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৩৭ জনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের হয়ে ফের নির্বাচনে লড়ার আগ্রহ দেখাননি। দলের নেতৃত্বের একাংশের দাবি, এবার প্রার্থী হলে আর আগের মতো আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। নিজের সামর্থ্যের ওপর ভরসা করেই নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে হবে। সেই কারণেই অনেক প্রাক্তন কাউন্সিলর ভোটের ময়দান থেকে সরে থাকার কথা ভাবছেন। অন্যদিকে, বিদায়ী কাউন্সিলরদের একাংশের বক্তব্য, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আগের মতো দলের অনুগামী ও সমর্থকদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনে না লড়ার পিছনে এটিও অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
‘মমতা তৃণমূলে’র রাজ্য সাধারণ সম্পাদক বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “ক্ষমতার সঙ্গে থাকার প্রবণতায় অনেক প্রাক্তন কাউন্সিলর বিজেপির টিকিট পেতে চাইছেন। আবার কিছু প্রাক্তন কাউন্সিলর বিজেপির হামলা ও পুলিশি হেনস্তার ভয়ে পুরভোট থেকে দূরে থাকতে চাইছেন।” তাৎপর্যপূর্ণ হল, রাজ্যের সর্বত্রই নানা ওয়ার্ডে কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠরা ইতিমধ্যে বিজেপির হয়ে ‘জনকল্যান শিবিরে’র মতো নানা সরকারি কর্মসূচিতে সক্রিয় হয়েছেন। অন্যদিকে বিজেপি রাজ্য অফিসের ছবি, ড্রপবক্সেই কলকাতার ২০৯ ওয়ার্ডের জন্য পাঁচ হাজারের বেশি বায়োডাটা জমা পড়েছে। সেগুলি এখন স্ক্রিনিং চলছে। সময় যত এগিয়ে আসছে, শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মডুমদার, তাপস রায়, সজল ঘোষ, রীতেশ তিওয়ারির বাড়িতে আবেদনকারীদের ভিড় বাড়ছে। পুরভোটে পদ্মের টিকিট চাইছেন ডাক্তার, আইনজীবীর মতো সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। আগেরবার ঠিক এমন ছবি ছিল তৃণমূল ভবনের। বিজেপির দাবি, খুব কম হলে কলকাতার ১৮০ টি ওয়ার্ড জিতব। বস্তুত সেই কারণে পদ্ম শিবিরে এখন জোর চর্চা চলছে কে মেয়র হবেন, কারা কারা মেয়র পারিষদ হতে পারেন তা নিয়ে।
টানা দশ বছর ও তাঁর আগে যাঁরা কলকাতা কর্পোরেশনের বোর্ড চালিয়েছেন, সেই তৃণমূল কংগ্রেসের দুই প্রাক্তন মেয়র এখনও পর্যন্ত নির্বাচনী ময়দানে নেই। শোভন চট্টোপাধ্যায় আপাতত সক্রিয় রাজনীতিতে নেই। আর ফিরহাদ হাকিম প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, তিনি বা তাঁর মেয়ে পুরভোটে প্রার্থী হচ্ছেন না। প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের নিজের ওয়ার্ড ২২ নম্বর মহিলা সংরক্ষিত। তাই এখনও তিনি বা তাঁর মেয়ে প্রিয়দর্শিনী ভোটে লড়া নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাননি। উত্তরের স্বপন সমাদ্দার বা দক্ষিণের সন্দীপরঞ্জন বক্সী, দুই প্রাক্তন দাপুটে মেয়র পারিষদ আসন্ন পুরভোটে প্রার্থী হবেন না বলে জানিয়েছেন। দু’জন পৃথক কারণ বলেছেন। সন্দীপ বক্সীর ওয়ার্ড মহিলা সংরক্ষিত হয়েছে, তাই অন্য কোথাও যাবেন না। আর স্বপনবাবুর স্পষ্ট কথা, “আমার বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলায় এখনও সম্পূর্ণ জামিন পাইনি। আর নতুন-পুরানো ওয়ার্ড মিলিয়ে ৫২টি ছেলের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এসব ‘ক্লিয়ার’ না হওয়া পর্যন্ত ভোটে লড়ার প্ল্যান নেই।” বেহালার সঞ্চিতা মিত্র, ঘনশ্রী বাগ, রাসবিহারীর মনীষা বসু-সহ উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বহু প্রাক্তন কাউন্সিলর ‘আর রাজনীতিতে নেই’ বলে ইতিমধ্যে জানিয়েছেন। তবে ভোটে লড়বেন প্রাক্তন কাউন্সিলর রত্না শূর, রূপক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মমতা-সৈনিকরা। বেহালার প্রাক্তন বরো চেয়ারম্যান তথা প্রাক্তণ মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পাঁচ বারের চিফ ইলেকশন এজেন্ট অঞ্জন দাসের বক্তব্য, ভোটে দাঁড়ালে হামলা হতে পারে জেনেও মমতাদির প্রার্থী হব। বৈশ্বানর ও তাঁর স্ত্রী চৈতালী দু’জনে বিদায়ী বোর্ডের মেয়র পারিষদ ও বরো চেয়ারম্যান ছিলেন। ভোটে প্রার্থী হওয়া নিয়ে বৈশ্বানরের বক্তব্য, “দু’জনেই প্রার্থী হতে চাই না। তবে মমতাদি নির্দেশ দিলে আমায় কোথাও একটা দাঁড়াতে হবে।”
ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য যুব সভাপতি সৌরভ বসু আগে ছিলেন ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, কিন্তু এবার সেখানে মহিলা সংরক্ষণ হওয়ায় হাজরা-রাসবিহারী এলাকা থেকে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। প্রাক্তন মেয়র পারিষদ তথা বর্তমানে ঋতব্রত শিবিরের পরিষদীয় দলের ডেপুটি লিডার সন্দীপন সাহা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘পুরভোটে কলকাতার ২০৯টি ওয়ার্ডেই প্রার্থী দেবে ডেমোক্রেটিক তৃণমূল কংগ্রেস।’ তবে ঋতশিবিরের ঘনিষ্ঠমহলের সূত্রে খবর, সংখ্যালঘু প্রধান এলাকার প্রাক্তন ‘জোড়াফুল’ কাউন্সিলররা এবার মমতা-তৃণমূলের প্রার্থী না হলেও ডেমোক্রেটিক তৃণমূলের হয়ে ‘খাম’ চিহ্নে পুরভোটে লড়বেন। অবশ্য কালীঘাট-তৃণমূলের দাবি, “খিদিরপুর, গার্ডেনরিচ, তপসিয়া, তিলজলা, এন্টালি, বালিগঞ্জ এবং কসবার বিধানসভার একটা বড় অংশে বিজেপির সঙ্গে জোর লড়াই হবে মমতা-তৃণমূলের। ভোটের দিন এই সব এলাকায় ১৯৯০ সালের পুরভোটের ছবি ফিরে আসতে পারে।” সবচেয়ে বড় কথা, মধ্য ও উত্তর কলকাতার বহু প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর ফোনে পুরভোটে লড়াই নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাইছেন না। সবাই ‘ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পরিবার’এর আপত্তির কথা বলে আপাতত পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন।
