
ঢাকা : চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের পছন্দের শীর্ষে ভারত। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। আর বছরে ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেডিকেল ট্যুরিস্ট বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছেন। তাই চিকিৎসা খাতে ভারতের উপর নির্ভরতা কমাতে চিনের বেসরকারি কোম্পানি বড়সর বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বমানের হাসপাতাল করার। তবে পিছিয়ে নেই ভারতও। এরই মধ্যে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষাণা এসেছে বিশ্বখ্যাত ভারতের ডিসান হাসপাতালের পক্ষ থেকে।
জানা গেছে, ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরে বিশ্বমানের ৫০ হাজার শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল করার প্রস্তাব দিয়েছে চিনা প্রতিষ্ঠান। চিনের এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়েছে সরকারের উচ্চ মহলে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে চিনের বেসরকারি বিনিয়োগ তথা ৫০ হাজার শয্যার হাসপাতালের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, কিংবা কিভাবে কোনপর্যায়ে এটা হতে পারে এসব বিষয় নিয়ে বৈঠক করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে ২০২১ সালে চিনা কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসার পরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এনিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক হলেও এবিষয় আর এগায়নি।
জানা যায়, হাসপাতাল নির্মাণে চিনের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবেই নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরে বিশ্বমানের ৫০০ থেকে ১০০০ শয্যার হাসপাতাল করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় কিংবা আদৌ এত সংখ্যক বেডের হাসপাতালের প্রয়োজন আছে কি না, অর্থায়ন কিভাবে হবে তার সবদিক পর্যালোচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয় কয়েকটি একটি বৈঠক বৈঠক হয়।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এক নোটিশে থেকে জানা গেছে, বিভাগ ও জেলাপর্যায়ে চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিএমইসি) দেওয়া হাসপাতাল স্থাপন প্রস্তাবের (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট-ইওআই) ওপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। প্রস্তাবিত, বিভাগীয় এবং জেলা শহরের হাসপাতাল হবে অনেকটা ডিজিটাল। হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও নার্সের ৭০ শতাংশ থাকবে বাংলাদেশী। বাকি ৩০ ভাগ বিদেশী। চিনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রত্যেক হাসপাতালের সাথে যুক্ত থাকবে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। যেখানে চিকিৎসক, নার্সের পাশাপাশি টেকনিশিয়ানদের নিয়মিত প্রশিক্ষণে গড়ে তোলা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিনা প্রস্তাবে প্রতি বছর উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে কয়েক লাখ লোকের বিদেশে যাওয়া এবং এতে কমপক্ষে গড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদেশে চলে যায়। চিনা প্রস্তাবে এ বিপুল অংকের অর্থ চলে যাওয়ার বিষয়টি ফোকাস করা হয়েছে। বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নিতে যাওয়া লোকদের কথা মাথায় রেখেই বিশ্বমানের হাসপাতাল নির্মাণে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী বলে চিনের পক্ষ থেকে প্রস্তাবে বলা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার ভারতের বহুভাষী সংবাদস্থা হিন্দুস্থান সমাচারকে বলেন, দেশেই উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। আর স্বাস্থ্য খাতে চিনের বিনিয়োগের বিষয়টা তাঁর জানা নেই।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায় বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চিনা বিনিয়োগের ব্যাপারে কোনধরণের পদক্ষেপ নিতে চায় না সরকার।
তবে বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ব্যাপারে পিছিয়ে নেই ভারতও। এরই মধ্যে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষাণা এসেছে ভারতের ডিসান হাসপাতালের পক্ষ থেকে। সামনে বিনিয়োগ আরও বাড়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের হেলথ কমিটির চেয়ারম্যান ও চার্নক হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত শার্মা।
প্রশান্ত শর্মা সাংবাদিকেদের বলেন, বাংলাদেশি রোগী এক বছরে ভারতে পাঁচশ মিলিয়ন ডলার খরচ করছে। চিকিৎসাটা যদি বাংলাদেশে হয় তাহলে হয়তো দেড়শ কিংবা আড়াইশ মিলিয়নে হয়ে যাবে। যদি রোগীদের চিকিৎসা বাংলাদেশে হয়। এখানে হাসপাতাল খারাপ আছে তা তো নয়। এখানে অনেক ভালো হাসপাতাল আছে। কিন্তু ভারতে কয়েকটি জায়গায় ক্লিনিক্যাল দক্ষতা আছে। সেই দক্ষতা যদি এখানে এনে চিকিৎসা করা হয়, তাহলে সেটা খুবই ভালো হবে।
আমার মনে হয় বিদেশি চিকিৎসকদের পরিচালনার বিষয়টি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সরকারকে একটু ভাবতে হবে। এটা একটু বিরোধপূর্ণ, কারণ দুনিয়ার প্রত্যেক দেশেই ডাক্তার সমাজ নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা রাখেন। বাংলাদেশের জন্য যদি এই নিয়মটি শিথিল করা হয় তাহলে অতো রোগী বাইরে যাবে না। বাইরের চিকিৎসকরা এখানে এসে বা বাইরের হাসপাতাল এখানে এসে চিকিৎসা করতে পারবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬৫৪টি এবং এসব হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ৫১ হাজার ৩১৬টি। আর বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫ হাজার ৫৫টি, সেখানে শয্যা সংখ্যা ৯০ হাজার ৫৮৭টি। দেশে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে।
উল্লেখ্য প্রতিবছর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ভুল চিকিৎসার কারণে ১ কোটি ৩৪ লাখ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। তবে বাংলাদেশে এর কোনও পরিসংখ্যান নেই।
তবে ভুল চিকিৎসার শিকার বাংলাদেশে বেশি হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আর ভুল চিকিৎসার জন্য দায়ী চিকিৎসকদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নামে মাত্র ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকরীতা নেই বললেই চলে। তাই একটু ভালো ও উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষ ছুটে যান বিদেশে। আর বিদেশী বিনিয়োগে দেশেই বিশ্বমানের হাসপাতাল হলে এর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজরা।
