
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: হ্যারি পটারের জাদুর দুনিয়ার সেই বিখ্যাত হগওয়ার্টস স্কুলের কথা মনে আছে? যেখানে জাদুবিদ্যার পাঠ নিতে দূরদূরান্ত থেকে হাজির হতো খুদেরা! সেই কল্পনার জাদুর জগৎ এবার বাস্তবের অনেকটা কাছাকাছি আসতে চলেছে কলকাতায়। জাদুর রহস্য, ইতিহাস এবং শিল্পকৌশল সম্পর্কে আগ্রহী নতুন প্রজন্মের জন্য এবার বিশেষ উদ্যোগ নিতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যে গড়ে উঠতে চলেছে একটি আধুনিক ম্যাজিক স্কুল। পাশাপাশি জাদুশিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিবর্তনকে তুলে ধরতে তৈরি করা হবে একটি বিশেষ মিউজিয়াম। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলার সাংস্কৃতিক ও বিনোদন জগতের মুকুটে যুক্ত হতে পারে নতুন পালক।
বাংলার সঙ্গে জাদুশিল্পের সম্পর্ক বহু পুরনো। এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছেন এমন একাধিক জাদুকর, যাঁরা নিজেদের অসাধারণ দক্ষতা ও অভিনব উপস্থাপনার মাধ্যমে দেশ-বিদেশের দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। বিশেষ করে ভারতীয় জাদুশিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে বাঙালি জাদুকরদের অবদান উল্লেখযোগ্য। সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে জাদুবিদ্যাকে একটি সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম হিসেবে তুলে ধরাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ম্যাজিক স্কুলে কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, কীভাবে সাজানো হবে তার পরিকাঠামো এবং কোন কোন বিষয়কে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। স্কুলটি শুধুমাত্র হাতসাফাই বা চোখের ধাঁধার কৌশল শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই প্রত্যাশা। জাদুর বিভিন্ন শাখা, মঞ্চে পরিবেশনার কৌশল, দর্শকদের মনস্তত্ত্ব, উপস্থাপনার দক্ষতা এবং জাদুশিল্পের নেপথ্যের বিজ্ঞান সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের ধরন এখনও নির্ধারণের অপেক্ষায়।
এই প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে জাদুর ইতিহাস নিয়ে প্রস্তাবিত মিউজিয়াম। সেখানে ভারত তথা বাংলার জাদুশিল্পের বিবর্তন, প্রখ্যাত জাদুকরদের জীবন ও কাজ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রদর্শনীর স্মারক তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। জাদুর সঙ্গে জড়িত পুরনো সরঞ্জাম, বিশেষ কৌশল এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার নানা নিদর্শন সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই শিল্পের সমৃদ্ধ ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে এই মিউজিয়াম কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, জাদুশিল্প নিয়ে গবেষণা ও চর্চার ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই উদ্যোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ করতে ইতিমধ্যেই গঠন করা হয়েছে একটি বিশেষ উপদেষ্টা কমিটি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কিংবদন্তি জাদুকর পি সি সরকার জুনিয়রকে। জাদুর জগতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পরিচিতি এবং মঞ্চে অভিনব উপস্থাপনার দক্ষতা এই প্রকল্পের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ম্যাজিক স্কুলের কাঠামো কেমন হবে, প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু কী হওয়া উচিত এবং মিউজিয়ামকে কীভাবে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, সেই সমস্ত বিষয়ে তাঁর পরামর্শ বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হলে এই উদ্যোগ বাংলার জাদুশিল্পকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। এতদিন জাদু মূলত মঞ্চের বিনোদন হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, ঐতিহাসিক নথি সংরক্ষণ এবং গবেষণার সুযোগ তৈরি হলে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নতুন প্রজন্মের সামনে পেশাগত সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কলকাতার সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও এই ম্যাজিক স্কুল ও মিউজিয়াম নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রকল্পটির বাস্তব রূপ দিতে এখনও বেশ কিছু পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাকি। কোথায় এই প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে, কবে থেকে কাজ শুরু হবে, প্রশিক্ষণের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য মিউজিয়াম কবে খুলে দেওয়া হবে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসার অপেক্ষা। সব মিলিয়ে, কলকাতায় ম্যাজিক স্কুল ও জাদুর ইতিহাসের মিউজিয়াম তৈরির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির জগতে একটি অভিনব সংযোজন হতে চলেছে। হগওয়ার্টসের মতো কল্পনার জাদুর স্কুল না হলেও, বাস্তবের মাটিতে জাদুশিল্প শেখার এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে বাংলার নতুন প্রজন্মের সামনে খুলে যেতে পারে এক অন্যরকম সম্ভাবনার দরজা।
