
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক:এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় চাকরি হারানো শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। আদালতের নির্দেশ মেনে তাঁদের প্রাপ্ত বেতন সুদ-সহ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে খবর সামনে আসতেই দুশ্চিন্তায় বহু পরিবার। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় জেলাশাসকদের কাছে এ বিষয়ে প্রশাসনিক নির্দেশ পৌঁছতে শুরু করেছে।
রাজ্য এসএসসির অধীনে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর কলকাতা হাই কোর্ট কয়েক হাজার নিয়োগ বাতিল করে। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, যাঁরা প্যানেলের বাইরে থেকে নিয়োগ পেয়েছেন, প্যানেলের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরে চাকরি পেয়েছেন অথবা ফাঁকা ওএমআর জমা করেও নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত বেতন সুদ-সহ ফেরত দিতে হবে। পরে সুপ্রিম কোর্টও এই নির্দেশ বহাল রাখে। যদিও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চাকরিহারাদের একাংশ পৃথক মামলা করেছেন এবং সেই মামলা এখনও বিচারাধীন। প্রশাসনিক স্তরে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে খবর সামনে আসতেই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। চাকরিহারা শিক্ষকদের একাংশের দাবি, যদি পুরো বেতন সুদ-সহ ফেরত দিতে হয়, তাহলে মাথাপিছু প্রায় ৪৪ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এমন বিপুল অঙ্কের টাকা ফেরত দেওয়া অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই কার্যত অসম্ভব।
সিউড়ির এক চাকরিহারা শিক্ষিকা শতাব্দী সরকার বলেন, “টাকা ফেরতের বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি নোটিস হাতে পাইনি। তবে আদালতের রায়ে যাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, আমি সেই তালিকায় পড়ি না। আমি পরীক্ষা দিয়ে সম্পূর্ণ উত্তর লিখেছিলাম। তাই আমার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। কিন্তু শোনা যাচ্ছে, সব চাকরিহারার কাছ থেকেই টাকা ফেরত চাওয়া হতে পারে। সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।” তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ ও হতাশা। শতাব্দী বলেন, “আমাদের চাকরি যদি অবৈধ হয়েও থাকে, আমরা তো সাড়ে ছয় বছর ধরে নিয়মিত স্কুলে গিয়ে পড়িয়েছি। ছাত্রছাত্রীদের দায়িত্ব পালন করেছি। আমাদের সেই পরিশ্রমের কি কোনও মূল্য নেই? জেলের কয়েদিরাও শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক পান। তাহলে আমাদের শ্রমকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হবে কেন?”
চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের একটি বড় অংশের মতে, একদিকে চাকরি হারিয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে কয়েক বছরের বেতন সুদ-সহ ফেরতের চাপ তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে দিতে পারে। অনেকেই ইতিমধ্যে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। কারও সন্তান উচ্চশিক্ষায়, কারও পরিবারের চিকিৎসার খরচ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কয়েক লক্ষ টাকা ফেরত, তাঁদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী পথ নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেকে। কেউ সম্মিলিতভাবে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা ভাবছেন, কেউ পৃথকভাবে আইনি পরামর্শ নিচ্ছেন। তাঁদের আশা, আদালত দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত এবং প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করবে এবং সেই অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত দেবে। জেলায় এখনও আনুষ্ঠানিক নির্দেশ না এলেও উদ্বেগের পারদ ক্রমশ চড়ছে। জেলার প্রায় আড়াইশো শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা এখন একটাই প্রশ্ন তুলছেন-‘আমাদের শ্রমের কি কোনও মূল্য নয়।
