
দুর্গাপুর, ১৫ জুলাই: শরীরে বাসা বেঁধেছে দুরারোগ্য রোগ। তবুও দমেনি। দিনরাত পথপশুদের চিকিৎসা, সেবায় মগ্ন। মারণ রোগকে সঙ্গে নিয়ে এক মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীকে স্নান করিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করল দুর্গাপুরের অবন্তিকা। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় দুই সমাজসেবী ও পরিবেশকর্মী।
অবন্তিকা রায়। দুর্গাপুর হোষ্টেল অ্যাভিন্যুয়ের বাসিন্দা। নিজের শরীরে ধমনীর সমস্যায় জর্জরিত। ইতিমধ্যে ৩০ টিরও বেশী কেমো নিয়েছে। দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। মাঝে কোভিডেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবুও থেমে থাকেনি। লক্ষ্যে অবিচল। গত সাত বছর ধরে আহত পথ পশুদের চিকিৎসা ও সেবা করে চলেছেন। দুর্গাপুর শিল্পশহরের অলি গলিতে আহত পথপশুর সন্ধান পেলেই মুহুর্তেই ছুটে যায় সেবাশুশ্রুষার জন্য। কুকুর, বিড়াল, কিম্বা যেকোন পথপশুর ওপর নিষ্ঠুর আক্রামনের প্রতিবাদে সরব হন তিনি। পথ পশু ছাড়া রাস্তা অসহায় ভবঘুরেদেরও সেবা করে থাকেন। শনিবার দুর্গাপুর বিধাননগর মোড়ে এক মানসিক ভারসাম্যহীনকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকার খবর পান তিনি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। দীর্ঘদিন স্নান না করায় শরীরে দুর্গন্ধ। এমনকি পরনের কাপড়টুকুও নেই। সেলুলাইটসে আক্রান্ত। আর তার জেরে অসাড় হয়ে পড়েছে ওই ভবঘুরে। বেগতিক বুঝে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সহযোগিতায় তাকে স্নান করিয়ে দেন। শরীরে জীবনামুক্ত করতে পাওডার লাগিয়ে দেন। এবং নতুন জামা প্যান্ট পরিয়ে হালকা খাবারও নিজে হাতে খাইয়ে দেন তিনি। তবে এদিন প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আগাম দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসক হাজির ছিলেন। ঔষধ, আহার ও পরিধেয় বস্ত্র কিনতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন সমাজসেবী অমিতাভ ব্যানার্জী ও পরিবেশকর্মী কৌশিকি ঘটক।
উল্লেখ্য, করোনা আবহের লকডাউনের জেরে দোকান, বাজার, হোটেল প্রায় সবই ছিল বন্ধ। তার জেরে সঙ্কটে পড়েছিল পথ পশু ও ভবঘুরেরা। ওইসময় সঙ্কটজনক অবস্থায় নিজের সেবা কাজ জারি রেখেছিলেন অবন্তিকা। লকডাউনের শুরুর দিন থেকে দুর্গাপুর ভিড়িঙ্গী মোড়, গান্ধীমোড়, সিটিসেন্টার, আদালত চত্ত্বর, বিভিন্ন শপিংমল এলাকায় পথ কুকুরদের নিয়ম করে খাবার দিয়েছেন। এখনও তার সেই কাজ জারি রয়েছে। সকালে কখনও বিস্কুট, পাউরুটি। দুপুরে দুধভাত, আবার রাত্রে ভাত কিম্বা রুটি। তার সঙ্গে মাঝে মধ্যে প্রোটিনযুক্ত খাবার। শুধু পথকুকুর নয়, একই সঙ্গে অসহায় ভবঘুরে, রোগী, ভিক্ষুকদেরও বিস্কুট, পাউরুটি দেন। তার সেবাকাজে সরকারি সাহায্য ছাড়াও অনেক শুভাকাঙ্খী মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাড়িয়ে দিয়েছেন সাহায্যের হাত। কেউ চাল, কেউ বিস্কুট আবার কেউ চিড়ে দিয়ে সাহায্য করেন।
অবন্তিকা জানান," দৈনিক ১৫০-১৬০ টি কুকুরকে খাবার দিতে হয়। একই সঙ্গে তাদের চিকিৎসা করা হয়। এছাড়াও ৯-১০ জন ভবঘুরেকে নিয়ম করে খাবার দিতে হয়। এদিন খবর পেয়ে ওই ভবঘুরে রোগীটির কাছে পৌঁছায়। রোগ যন্ত্রনায় উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ ছিল না তার। সাবান দিয়ে স্নান করিয়ে পরিস্কার করানো হয়। তারপর দুর্গাপর মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য তাকে ভর্তি করা হয়।" তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন," এধরনের অনেক ভবঘুরের চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু তাদের একত্রিত করে সেবা শ্রুশষা করার জন্য তেমন কোন আবাসিক হোম না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়। তখন বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। তাই সরকারিভাবে অসুস্থ ভবঘুরেদের রাখার জন্য আবাসিক হোম করলে ভালো হয়।" পরিবেশকর্মী কৌশিকি ঘটক জানান," মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা ও সহানুভুতিশীল হওয়া দরকার। অনেক সময় এধরনের ভবঘুরেদের খাবারের বদলে পাথর ছুড়ে মারা হয়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে অবন্তিকাকে কুর্নীশ জানাই। দুর্গাপুরে এধরনের ভবঘুরেদের রাখার জন্য আবাসিক হোম তৈরীর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।"
