
first comprehensive collection of astronomyকলকাতা, ১৪ ডিসেম্বরঃ “কে প্রথম চাঁদে গেছে বল তো নাম নীল আর্মস্ট্রং, আর্মস্ট্রং“আজও যেন বাঙালির কানে বাজে গানের সেই কলির মূর্চ্ছনা। ১৯৬৯ সালের চন্দ্রজয়ের পর গীতিকার শ্যামল গুপ্ত লেখেন অসাধারণ গানটি। তার পর ১৯৭১-তে ‘জয়জয়ন্তী’ সিনেমার মাধ্যমে দূর্দান্ত হিট। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় গান হয়ে ওঠে ওটি।
সেই আর্মস্ট্রংদের নিয়ে কলকাতায় তৈরি হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহশালা। রেল থেকে যুদ্ধবিমান, জাহাজ থেকে নৌকো, ব্যাঙ্ক থেকে ডাক সামগ্রি, প্রত্নতত্ব থেকে পুরাতত্ব— হরেক রকম বিষয়ভিত্তিক সংগ্রহশালা আছে কলকাতায়। বিজ্ঞানের ওপরেই রয়েছে অন্তত তিনটি সংগ্রহশালা। কিন্তু কেবল মহাকাশবিজ্ঞানের ওপর? তৈরি হচ্ছে দক্ষিণ কলকাতায়। গোটা দেশে এরকম প্রকল্প এই প্রথম। উদ্বোধন হবে ২৮ ফেব্রুয়ারি, বিজ্ঞান দিবসে।
কলকাতায় বসেই এ বার ছোঁয়া যাবে চাঁদ, মঙ্গলকে! স্পর্শ করা যাবে চাঁদ, মঙ্গলের দুর্লভ পাথর খণ্ডগুলিকে। ছোঁয়া যাবে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝখানে থাকা গ্রহাণুদের সাম্রাজ্য- গ্রহাণুপুঞ্জ (‘অ্যাস্টারয়েড বেল্ট’) থেকে ছিটকে বেরিয়ে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা গ্রহাণুদের শরীরের বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য, দুর্মূল্য অংশও।
যাঁর বহু দিনের স্বপ্ন এই সংগ্রহশালা গড়া, তিনি কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্স (আইসিএসপি)’-এর অধিকর্তা জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক সন্দীপ চক্রবর্তী। বুধবার তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমি নাসায় গবেষণা করেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন মহাকাশবিজ্ঞানের গবেষণাকেন্দ্রে গিয়েছি বা কাজ করেছি। কিন্তু যেরকম তৈরি হচ্ছে কলকাতায়, সেরকম আর কোথাও চোখে পড়েনি।“
১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই ‘স্যাটার্ন ৫’ রকেটে চেপে চাঁদে পাড়ি দিয়েছিল ‘অ্যাপোলো ১১’। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ হয়েছিল অ্যাপোলো ১১-র। তিন জন মার্কিন মহাকাশচারী সে দিন চাঁদের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। নিল আর্মস্ট্রং, এডুইন (বাজ) অলড্রিন এবং পাইলট মাইকেল কলিন্স। চাঁদের মাটিতে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং। তার পরে নামেন এডুইন অলড্রিন। কলিন্স মহাকাশযানেই ছিলেন। চাঁদে নামেননি।
“২০২১-এর জানুয়ারিতেই আমাদের কাজ হয়ত শেষ হয়ে যেত।“ এ কথা জানিয়ে সন্দীপবাবু বলেন, কিন্তু কোভিড পরিস্থিতির জন্য কাজকর্ম মাঝেমধ্যে থমকে গিয়েছে। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস কানেকটরে রবির মোড়ের ঢিল ছোড়া দূরত্বে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসে আইসিএসপি-র ৩৭ হাজার বর্গ ফুট জমির একাংশে নির্মিয়মান পাঁচ তলা ভবনের প্রথম দুটি তলায় গড়ে তোলা হচ্ছে এই মহাকাশ সংগ্রহশালা।
প্রাথমিক ভাবে ৩৮ হাজার বর্গ ফুটের ভবন তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ১৪,৪০০ বর্গ ফুটের কাজ প্রায় শেষ। সংগ্রহশালাটি হবে ১০ হাজার বর্গ ফুটের ওপর। এই তথ্য জানিয়ে সন্দীপবাবু বলেন, “অন্তত পাঁচশো দ্রষ্টব্য থাকবে সেখানে। ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা থেকে শুরু করে কল্পনা চাওলা— যুগে যুগে যেসব বিজ্ঞানী মহাকাশ-গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন, আবিস্কার করেছেন সৌরজগতের আপাত অজানা নানা কথা— সেগুলো তুলে ধরা হবে এই সংগ্রহশালায়। থাকবে তাঁদের ছবি, সই প্রভৃতি। পুরনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট নানা তথ্যের কাটিং।
প্রস্তাবিত সংগ্রহশালায় থাকবে ‘চাঁদের ঘর’। ‘স্পেস স্যুট’ পড়ে দর্শক চলে যেতে পারবেন কল্পলোকে। ‘হল অফ ফেম’-এ থাকবে প্রায় ২০০ জন বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানীর কথা। চন্দ্রশেখরের নিজের পড়া, নাম লেখা বেশ ক’টা বই। সংগ্রহশালা গড়ে তোলার জমি ও তার পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৪০ লক্ষ টাকা অর্থসাহায্য করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার দিয়েছে ৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাড়ে তিন কোটি টাকা ইতিমধ্যে খরচ হয়েছে ভবন তৈরির জন্য।
সেই চাঁদের পাহাড়ের পাথর, পাঁচ দশক পর ২০২৪-এ যে মুলুকে ফের মহাকাশচারী পাঠাচ্ছে নাসা। কলকাতায় বসেই আমি, আপনি এ বার ছুঁতে পারব পৃথিবী থেকে প্রায় সাড়ে ৩৯ কোটি কিলোমিটার দূরের ‘লাল গ্রহ’ মঙ্গলের শিলাখণ্ডও। যে সব শিলাখণ্ডের উপর এখন লাল গ্রহে কড়া নজর রেখে চলেছে নাসার পাঠানো ‘রোভার পারসিভের্যান্স’। অণুজীব বা অন্য যে কোনও রকমের প্রাণের অস্তিত্বের কোনও ‘পদচিহ্ন’ সেখানে মেলে কি না দেখতে। নজর রাখছে কিউরিওসিটি-সহ নাসা এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (এসা)-র আরও কয়েকটি ল্যান্ডার এবং রোভার।
এখনও পর্যন্ত অন্তত ১২ জন মহাকাশচারী চাঁদে গিয়েছেন। তাঁদেরই দু’জন নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন। বাকি যে ১০ মহাকাশচারী চাঁদে পা রেখেছেন তাঁরা ১৯৬৯-৭২ এর মধ্যে নাসার আরও পাঁচটি (অ্যাপোলো ১২, অ্যাপোলো ১৪, অ্যাপোলো ১৫, অ্যাপোলো ১৬ এবং অ্যাপোলো ১৭) চন্দ্রাভিযানের শরিক হয়েছিলেন। আর্মস্ট্রং এবং অলড্রিন অ্যাপোলো ১১-এ চেপে চাঁদে গিয়েছিলেন। এসবের হদিশ মিলবে কলকাতার প্রস্তাবিত সংগ্রহশালায়।
কাজ কেমন চলছে, তা দেখতে ক’দিন আগে ব্যাঙ্গালোরের ইসরো-র বিক্রম সারাভাই অধ্যাপক এবং ভারত সরকারের মহাকাশ কমিশনের সদস্য, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের গভর্নিং কাউন্সিলেয় সদস্য, মহাকাশ বিভাগের প্রাক্তন সচিব এবং ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার প্রাক্তন চেয়ারম্যান এ.এস. কিরণ কুমার এসেছিলেন এখানে। সব কিছু দেখে তিনি প্রীত। কিছু বিশেষ দ্রষ্টব্য দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
এ খবরের শুরুতে ছিল ‘জয়জয়ন্তী’-র গানের শুরুটা দিয়ে। ওই গানের শেষ ছিল “আমরা তেমন কিছু করলে আমাদেরও লোকে মনে রাখবে/ ইতিহাসে নাম লেখা থাকবে।“ আধুনিক প্রজন্মের পড়ুয়া-গবেষকদের ‘তেমন কিছু করতে’ অনুপ্রেরণা দেবে কলকাতার এই অনন্য সংগ্রহশালা।
