
শিলচর , ১৯ জুন: গত মে মাসের ৩ তারিখ থেকে মণিপুরে সহিংস ঘটনা সংগঠিত হচ্ছে। জাতি দাঙ্গায় অগ্নিগর্ভ আসমের পার্শ্ববর্তী রাজ্য মণিপুর। ৫০ হাজারের অধিক মানুষ আজও বাস্তুহারা। আতঙ্ক মানুষ বিভিন্ন শিবির এবং বহিঃরাজ্যে বসবাস করছেন। উদ্ভূত এই সমস্যার সমাধানে সম্প্রতি অনলাইনে বিশ্বহিন্দু পরিষদের ক্ষেত্র বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সোমবার গুয়াহাটি ক্ষেত্রের অন্তর্গত উত্তরপূর্ব প্রান্ত ও দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তের অধীন সব কয়টি জেলা থেকে এক যোগে রাষ্ট্রপতির উদ্যেশ্যে স্মারকপত্র প্রদান করা হবে।
এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আজ সোমবার দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তের অধীন, বরাক উপত্যকার সব কয়টি জেলা, ডিমা হাসাও, ত্রিপুরা রাজ্যের সকল জেলা নিয়ে মোট ১৭টি জেলা থেকে একযোগে স্থানীয় প্রশাসন মারফত ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকপত্র প্রেরণ করা হয়। এর আগে স্থানে স্থানে শান্তি মিছিলের আয়োজন করে মণিপুরে সংগঠিত ঘটনাবলির তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানানো হয়েছে।এদিন শিলচরে এক শান্তি মিছিলের আয়োজন করে বিশ্বহিন্দু পরিষদের দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তের অন্তর্গত শিলচর জেলা কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যরা। মিছিলে পা মেলান বজরং দলের সদস্যরাও। পরে মণিপুরে শান্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে ভিএইচপি শিলচর জেলার পক্ষে ভারতের রাষ্ট্রপতির উদ্দ্যেশ্যে কাছাড়ের জেলাশাসক মারফত এক স্মারকপত্র প্রদান করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিভাগ সম্পাদক মিঠুন নাথ, জেলা সম্পাদক আশিস দত্ত, অপুচন্দ্র দে, বিপ্লব দাস, চিরঞ্জিত সিনহা সহ আরও অনেকে।
এদিকে মনিপুরে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কাটিগড়ায়ও রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে স্মারকপত্র প্রেরণ করেছে পশ্চিম কাছাড় জেলা কমিটি।
সোমবার ভিএইচপি পশ্চিম কাছাড় জেলা কমিটির সভাপতি পরেশচন্দ্র পাল, সম্পাদক অশোককুমার দাস, দক্ষিণ পূর্ব প্রান্ত প্রচার ও প্রসার প্রমুখ শমীন্দ্র পাল, বিভাগ সংগঠন মন্ত্রী রথিশ দাস, তিন উপসভাপতি সহ অন্যরা কাটিগড়ার নবনিযুক্ত সার্কল অফিসার ড. রবার্ট টওলরের হাতে কাছাড়ের জেলাশাসক মারফত ভারতের রাষ্ট্রপতির উদ্দ্যেশ্যে এক স্মারকপত্র প্রেরণ করেন।
একইভাবে লক্ষ্মীপুরে প্রান্ত কার্যকর্তা দিলীপ দে, জেলা সভাপতি মুরলী দেবনাথ, রথিশ দাস, অক্ষয় গোয়ালা প্রমুখ উপস্থিত হয়ে মহকুমাশাসকের হাতে রাষ্ট্রপতির উদ্যেশ্যে স্মারকপত্র তুলে দেন।
অনুরূপভাবে শ্রীভূমি জেলায় করিমগঞ্জের জেলাশাসক মৃদুল যাদবের হাতে রাষ্ট্রপতির উদ্যেশ্যে স্মারকপত্র তুলে দেওয়া হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রান্ত সহ-সম্পাদক বিজিত দাস, জেলা সভাপতি রজত রায়চৌধুরী, জেলা সম্পাদক বিশ্বজিৎ নাথ চৌধুরী, বিভাগ সম্পাদক সমীর দাস, সমর দাস, প্রান্ত সহ-প্রচারপ্রমুখ সুজয় শ্যাম সহ অন্যরা।
এদিন দক্ষিণ কাছাড় জেলার উদ্যোগে সোনাই কালীবাড়ি থেকে এক শান্তি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি সোনাই সার্কল অফিসে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সার্কল অফিসার মারিয়া তানিমের কাছে রাষ্ট্রপতির উদ্যেশ্যে স্মারকপত্র তুলে দেন কার্যকর্তারা। স্মারকপত্র প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন, দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তের সেবাপ্রমুখ গোপাল ভট্টাচার্য, বজরং দলের শিলচর বিভাগ সংযোজক অমলেন্দু দাশ, বিশ্বহিন্দু পরিষদের দক্ষিণ কাছাড় জেলার সহ-সভানেত্রী চম্পা দাস, সহ-সম্পাদক সন্তোষ দেব, সোনাই প্রখণ্ড সভাপতি রথীশ দাস সহ অন্যরা।
উল্লেখ্য, মণিপুরে শান্তি ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে বিশ্বহিন্দু পরিষদ দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তের অধীন সকল জেলা থেকে এদিন ভারতের রাষ্ট্রপতির উদ্যেশ্যে স্মারকপত্র প্রদান করার কার্যসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এরই অঙ্গ হিসেবে এদিন বিভিন্ন জেলা থেকে রাষ্ট্রপতির উদ্যেশ্যে স্মারকপত্র প্রদান করা হয়।
বিশ্বহিন্দু পরিষদ দক্ষিণ পূর্ব প্রান্ত সভাপতি শান্তনু নায়েক জানান, পার্শ্ববর্তী রাজ্য মণিপুরে গত ৩ মে থেকে যে জাতিদাঙ্গা চলছে, এতে হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা৷ বহু লোকের প্রাণহানি হয়েছে। চলছে লুটতরাজ। জনজীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। জঙ্গলে অনেক মৃতদেহ এখনও পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। হয়তো এগুলি শনাক্ত হয়নি এখনও।
বিশ্বহিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে শান্তনু নায়েক অচিরে এ বিষয়ে সমাধানসূত্র বের করতে মণিপুর সরকার, ভারত সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার এবং প্রশাসন তাদের কর্ম পরিকল্পনা এমন ভাবে তৈরি করুন, যাতে অতি দ্রুত ভারতীয়দের নিজেদের মধ্যে চলমান জাতিদাঙ্গা অচিরেই বন্ধ হয় এবং স্থায়ী সমাধান বের হয়। মণিপুরে পুনরায় শান্তি স্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানান তিনি। শান্তনু নায়েক জানান, বিশ্বহিন্দু পরিষদের পক্ষে ইতিমধ্যে মণিপুরের আশ্রয় শিবিরে আশ্রিত ও নির্যাতনের শিকার অসহায় মানুষদের জন্য খাদ্য সামগ্রী ও কিছু বস্ত্র পাঠানো হবে।
তিনি ভারত সরকার, মণিপুর সরকার এবং প্রশাসনের কাছে এও দাবি জানান, যাঁরা নিহত হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন এবং জাতিদাঙ্গায় যাদের বসতবাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে, তাদের পুনর্বাসন সহ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ, জল ইত্যাদির জন্য যেভাবে হাহাকার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা থেকেও পরিত্রাণের উপায় বের করে জনজীবনকে স্বাভাবিক করে তোলা এবং সর্বাবস্থায় মণিপুরে শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান শান্তনু নায়েক।
বিশ্বহিন্দু পরিষদ প্রান্ত সভাপতি মণিপুরে শান্তি বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সামরিক বাহিনী মোতায়েন, চেক পয়েন্ট স্থাপন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধ করার জন্য ব্যাপক নজরদারি ব্যবস্থা করে তা বাস্তবায়ন করার দাবি জানান। এতে ওই রাজ্যে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিবিশেষ তাদের জীবন পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। বিশ্বহিন্দু পরিষদ দক্ষিণ পূর্ব প্রান্ত প্রচার ও প্রসার প্রমুখ শমীন্দ্র পাল এক প্রেসবার্তায় এ খবর জানিয়েছেন।
