
কোচবিহার ১৯ ফেব্রুয়ারি : গত ১১ ই ফেব্রুয়ারি মাথাভাঙ্গায় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী সভা থেকে সিতাইয়ে বিএসএফের হাতে গুলিবিদ্ধ প্রেম কুমার বর্মনের হত্যার প্রতিবাদে বিএসএফকে দায়ী করেন পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামানিকের বাড়ি ঘেরাওয়ের কর্মসূচি গ্রহণ করেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রবিবার দিনহাটা বিধানসভার ভেটাগুড়ি অঞ্চলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামানিকের বাড়ি ঘেরাওয়ের ডাক দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। ভেটাগুড়ি বাজারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাড়িতে ঢোকার গলির আগে মঞ্চ বানিয়ে বিক্ষোভ দেখান জেলা তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বরা। এবং এই মঞ্চের পাশেই রাস্তার দুধার দিয়ে তৃণমূল কর্মী সমর্থকদের বসানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো এলাকাকে দুর্গে পরিণত করে জেলা পুলিশ। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাড়িতে ঢোকার গলিতে বাশের বেরিকেড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি পৌঁছানোর আগে প্রায় চারখানা বাসের বেরিকেড দিয়ে আটকে দেওয়া হয় এবং ওই গলিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ফলে বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দিলেও শেষ পর্যন্ত মূল রাস্তার উপরে মঞ্চ বানিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তৃণমূল নেতৃত্ব ও কর্মীরা। সকাল থেকেই নিরাপত্তার চাদরে পুরো এলাকা মোড়ে ফেলা হয়। নিরাপত্তার খাতিরে কোচবিহার পুলিশের পক্ষ থেকে ড্রোন এবং সিসিটিভির ব্যবস্থা করা হয়। অপর পক্ষে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রায় একশোর বেশি সিআইএসএফ জওয়ান মোতায়েন করা হয় প্রতিমন্ত্রী বাড়ির সামনে। ফলে স্বভাবতই বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া তো দুরত্ব স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাড়ির দেড়শ মিটার আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয় সমস্ত রাস্তা। এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করে কোচবিহারে। তৃণমূল নেতৃত্ব জানিয়েছিলেন প্রায় পঁচিশ হাজার জমায়েত হবেন রবিবারের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে আর সে কারণেই শনিবার রাত থেকে ভেটাগুড়ির খেলার মাঠে ২৫ টি চুল্লিতে প্রায় দুই হাজার কেজি চালের খিচুড়ি রান্না করা হচ্ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত ধাপে ধাপে লোক এসেছিল তবে কখনোই একসাথে দু হাজারের বেশি লোক দেখতে পাওয়া যায়নি। প্রেম কুমার বর্মনের হত্যা প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব বারবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামানিককে আক্রমণ করেন। ঝর্ণা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী তথা দিনহাটার বিধায়ক উদয়ন গুহ কোচবিহার জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক সহ অন্যান্য নেতৃত্বরা তবে উল্লেখযোগ্যভাবে উপস্থিত ছিলেন না তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষিয়ান নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের কোচবিহার জেলার চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন। কাজের সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ কলকাতায় রয়েছেন এবং গিরিন বাবু বাংলাদেশ গেছেন বলে জানা গেছে। তবে জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন পুরনো কর্মী সমর্থকদের এই বিক্ষোভে সামিল হতে দেখা যায়নি ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে যে তাহলে কি গোষ্ঠী কোন্দলের ছবি ফুটে উঠল তৃণমূলের অন্তরে। যদিও উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ বলেন - প্রেম কুমার বর্মনের মৃত্যুর স্বাভাবিক নয় বিএসএফ হত্যা করেছে কারণ প্রেম কুমার বর্মন সীমান্ত থেকে প্রায় দু কিলোমিটার দূরে ছিল যখন সকালবেলা তিনি যান তখন বিএসএফ তাকে হত্যা করে তার ময়নাতদন্তের রিপোর্টে শরীর থেকে ১৮০ গুলির টুকরো উদ্ধার হয়। পাশাপাশি উদয়ন গুলো বলেন এই এলাকার তৃণমূল নেতৃত্বদের বলছি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর রাস্তার গলিতে সিসিটিভি লাগান এর পয়সা আমি দেব। রাতের অন্ধকারে অনেক তৃণমূল নেতৃত্বই তার সাথে দেখা করছেন তাদেরকে চিহ্নিত করে আগামী দিনের দল ব্যবস্থা নেবে। স্বভাবতই এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে নিয়ে বেশ চিন্তার ভাব ছিল ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কিছু দোকান খোলা থাকলেও ভেটাগুরি বাজারের বেশিরভাগ দোকানই ছিল বন্ধ। এর পাশাপাশি ভেটাগুড়ি যাওয়ার আগে রাজ্য সড়ক বেশ কিছুটা দূর থেকেই আটকে দিয়েছিল পুলিশ প্রশাসন ফলে দিনহাটাগামী গাড়িগুলিকে অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। আর এ কারণেই কিছুটা হলেও সমস্যার সম্মুখীন করতে হয় নিত্যযাত্রীদের। একদিকে যখন ভেটাগুড়িতে তৃণমূল কংগ্রেস স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি লাগুয়া মঞ্চ করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন সেই সময় প্রায় হাজার পাঁচেক বিজেপি কর্মী সমর্থক ও বিধায়কেরা কোচবিহার শহরের জমায়েত হয়ে কোচবিহারের রাজপথে ধিক্কার মিছিল করলেন। কোচবিহার জেলা বিজেপির সভাপতি তথা বিধায়ক সুকুমার রায় বলেন - এই ধরনের ঘটনা কোচবিহারের রাজনীতিতে বিরল। আমরা কখনো কারো বাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখাই না বিভিন্ন দপ্তর গুলি ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখায় তবে তৃণমূল কংগ্রেস যে পথ দেখালো আগামী দিনে দুর্নীতিতে যুক্ত তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বদেরও বাড়ি ঘেরাও হবে। পাশাপাশি বিজেপি কর্মী সমর্থকদের জন্য এদিন জেলা সদর কার্যালয়ের ভিতর খিচুড়ি ও রান্না করা হয়। প্রায় ৫০০ কেজি চালের খিচুড়ি রান্না করা হয় দূর-দূরান্ত থেকে আসা কর্মীদের খাওয়ানোর জন্য। রবিবার সকাল থেকেই শাসক ও শাসক বিরোধী বিক্ষোভে তাই উত্তাল হয়ে ওঠে কোচবিহার। এর আগে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাসে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল কোচবিহারের বিস্তীর্ণ অংশ রবিবারও সেই আশঙ্কা করেছিলেন সাধারণ মানুষ তবে বিক্ষোভ কর্মসূচি শাসক ও শাসক বিরোধী দল করলেও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু যেভাবে শাসক ও শাসক বিরোধী ভাষা সন্ত্রাস সামনে উঠে এলো তাতে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিবেশ যেরকম উত্তপ্ত হলো সেই রকম পঞ্চায়েত নির্বাচন যে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে না তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।
