
দুর্গাপুর, ২০ নভেম্বর : আবারও রাষ্ট্রায়ত্ত সেইলের দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানায় (ডিএসপি) দুর্ঘটনা। ব্লাস্ট ফার্নেস থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় হট ল্যাডেল উল্টে গরম গলিত স্ল্যাগ চাপা পড়ে মৃত্যু হল এক ঠিকা শ্রমিকের। ঝলসে গেল আরও ৩ শ্রমিক। রবিবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ঘটনাটি ঘটেছে দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার ২ নং ব্লাস্ট ফার্নেস। সেইল যখন সুবর্ন জয়ন্তী উৎসবে রক্তপাতহীন উৎপাদনের শপথ নিচ্ছে, তখন কারখানার শ্রমিক সুরক্ষায় নজরদারি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠল। ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।
দুর্গাপুর ইস্পাত সুত্রে জানা গেছে, মৃত ঠিকা শ্রমিকের নাম পল্টু বাউরী (৩৫)। দুর্গাপুর গোপালমাঠের বাসিন্দা। আহতদের নাম প্রশান্ত ব্যানার্জী, গোপীরাম, ও প্রশান্ত গোপ। আহতদের দুর্গাপুর ইস্পাত মেন হাসাপাতালে নিয়ে গেলে, আশঙ্কাজনক অবস্থায় দুজনকে দুর্গাপুরে এক বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দুজন প্রায় ৮০ শতাংশ ঝলসে গেছে বলে অভিযোগ।
ঘটনায় জানা গেছে, এইসব ঠিকাশ্রমিকরা বেসরকারী ঠিকাসংস্থার অধীনে রেললাইন রিপেয়ারের কাজ করছিলেন। ওই লাইন দিয়ে গলিত লোহা, গলিত স্ল্যাগ হট ল্যাডেল মাধ্যমে যায়। এদিন সাড়ে দশ'টা নাগাদ ২ নং ব্লাস্ট ফার্নেস থেকে হট ল্যাডেলে গরম গলিত স্ল্যাগ অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা উল্টে যায়।
ল্যাডেল থেকে গরম গলিত স্ল্যাগ পড়ে যায় ওইসব শ্রমিকদের ওপর। তাতেই চাপা পড়ে একপ্রকার ভষ্মীভুত হয়ে যায় পল্টু বাউরী। এবং বাকিরা ঝলসে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কারখানার দমকল বাহিনী ও উদ্ধারকারী দল। জল দিয়ে গোটা এলাকার তপ্ত স্ল্যাগ ঠান্ডা করে। এবং ঝলসে যাওয়া তিনজনকে ডিএসপি মেন হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁদের দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক বলে সূত্র মারফত জানা গেছে। ঘটনাকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে শিল্পাঞ্চল জুড়ে। প্রশ্ন উঠেছে, হট ল্যাডেলে গরম গলিত স্ল্যাগ পরিবহনের তদারকিতে। ল্যাডেলে গলিত স্ল্যাগ ঢালার পর, সেটি ঠিকমত লক করা হয়েছিল কি না প্রশ্ন উঠেছে।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর গত ১ মার্চ ল্যাডেল খালি করার সময় তরল স্ল্যাগ ছিটকে জখম হয় ৩ ঠিকাশ্রমিক। কন্টিনিয়াস কাস্টিং বিভাগের স্টিল মেল্টিং সপে (এসএমএস) ল্যাডেল মাধ্যমে তরল ইস্পাত ঢেলে দেওয়া হয়। ঢেলে দেওয়ার পর ল্যাডেলে তরল স্ল্যাগ পড়ে থাকে। উত্তপ্ত ওই তরল স্ল্যাগ প্রায় ৫০ ফুট উঁচু থেকে ক্রেন মাধ্যমে খালি করা হয়। ওইদিন একইরকম ভাবে ল্যাডেলের তরল স্ল্যাগ খালি করছিল। ওই সময় নীচে থাকা ওই তিন শ্রমিকের শরীরে ছিটকে লাগে উত্তপ্ত তরল স্ল্যাগ। তাতেই জখম হয় তিন ঠিকাশ্রমিক।
এছাড়াও গত ২০১৯ সালের ১০ সেপ্টম্বর কারখানার ভেতরে দুপুরে টিফিন খাওয়ার সময় ল্যাডেলের গলিত লোহা ছিটকে দগ্ধ হয় পানু সাহা ও মঙ্গোলি হাঁসদা নামে দুই মহিলা ঠিকাশ্রমিক। এছাড়াও ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারী কারখানার ব্লাস্ট ফার্নেসের কোলডাস্ট ইনজেক্ট (সিডিআই) পরিস্কারের কাজ করার সময় ডাস্টের সঙ্গে আচমকা আগুন ছিটকে বেরিয়ে এক আধিকারিক, দুই স্থায়ী ও দুই ঠিকাশ্রমিক আগুনে জখম হয়। চলতি বছর গত ১৮ ফেব্রুয়ারী ডিএসপির বেসিক অক্সিজেন ফার্নেস (বিওএফ) রিফেক্ট্রীর কাজ করার সময় রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে ৩ ঠিকাশ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হয় ৫ ঠিকাশ্রমিক। পর পর দুর্ঘটনায় কারখানার শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত সংস্থা সেইল যখন সুবর্ন জয়ন্তী উৎসবে রক্তপাতহীন উৎপাদনের শপথ নিচ্ছে। তখন কারখানার শ্রমিক সুরক্ষায় নজরদারি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। সিটু নেতা বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন," আমরা উদ্বিগ্ন। পুরোনো কারখানা, উৎপাদন সর্বোচ্চ। অথচ সেভাবে আধুনিকিকরন হয়নি। স্থায়ী অভিজ্ঞ শ্রমিক নিয়োগ হয়নি। অনভিজ্ঞ ঠিকাশ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর ফলে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে শ্রমিক সুরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে। সেন্ট্রাল সেফটি কমিটির রুটিন মিটিং ও পর্যবেক্ষন হয় না। যার ফল এধরনের দুর্ঘটনা। কারখানায় শ্রমিক সুরক্ষায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। সংস্থা সম্পুর্ন উদাসীন। তাই আমাদের আবারও দাবী জানাচ্ছি, নিয়মিত সেফটি কমিটি রুটিন পর্যবেক্ষন করতে হবে। এবং সংস্থাকে শ্রমিক সুরক্ষায় আরও সক্রিয় হতে হবে।" ডিএসপির জনসংযোগ আধিকারিক বেদবন্ধু রায় বলেন," খুবই দুঃখজনক ঘটনা। কি কারনে ঘটেছে, সেটা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যার্য়ের কমিটি গঠন হয়েছে। তদন্ত চলছে।"
