
সিউড়ি , ৬ জানুয়ারি : রেকর্ড রুম কোথায়? এই ব্যাঙ্ক কি কালো টাকা সাদা করার জায়গা! সিউড়ি কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কে হানা দিয়ে এমন চড়া সুরেই তল্লাশি শুরু করল সিবিআই।
বৃহস্পতিবার দুপুরে আচমকাই সিউড়ি সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে হানা দিল সিবিআই-এর টিম। ওই ব্যাঙ্কে এমন অনেকগুলি অ্যাকাউন্টের হদিশ পাওয়া গিয়েছে, যা বেনামে খোলা হয়েছে। প্রায় ১৭৭ টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে বলে দাবি সিবিআইয়ের ।
এদিন দুপুর ৩. ২০ নাগাদ সিবিআইয়ের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সিউড়ি বিবেকানন্দ রোডের কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কে হানা দেয়। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন গরুপাচার মামলার তদন্তকারী অফিসার সুশান্ত ভট্টাচার্য, অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার স্বরূপ দে সহ আরও এক জন। ব্যাঙ্কে ঢুকেই ম্যানেজার কে প্রশ্ন করেন, রেকর্ড রুম কোথায়? ইতস্তত উত্তর আসতেই ফের সিবিআই আধিকারিক প্রাক্তন ম্যানেজারকে রীতিমতো হুমকির সুরে বলেন,' আপনি যা জানেন বলে দিন৷ এই ব্যাঙ্ক কি কালো টাকা সাদা করার জায়গা? কাকে লুকচ্ছেন একজন ব্যাঙ্ক কর্মী হয়ে?' এরপরেই তাঁরা চলে যান ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের রুমে। সেখানে প্রাক্তন ব্যাঙ্ক ম্যানেজার ইন্দ্র কুমার গুরুং এবং বর্তমান ব্যাঙ্ক ম্যানেজার অভিজিৎ সামন্তকে জিজ্ঞেসাবাদ শুরু করেন। প্রায় তিনঘন্টা ধরে সিবিআই আধিকারিকরা ব্যাঙ্কে থাকার পর এক ব্যাগ নথি এবং পেন ড্রাইবে করে বেশকিছু নথি সংগ্রহ করে সন্ধ্যা ৬ টা ২০ নাগাদ ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে যান।
গরু পাচার মামলার তদন্তে নেমেই সিবিআই এদিন কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কে হানা দেয়। সিবিআই দাবি, তদন্তে নেমে প্রাথমিক ভাবে উদ্ধার হয় ১৭৭ টি জাল vঅ্যাকাউন্ট। সিবিআইয়ের দাবি প্রতিটি অ্যাকাউন্টে সই একজনেরই। তবে সব অ্যাকাউন্টগুলিতেই একজন ব্যাক্তি বিভিন্ন নামে সই করেছেন বলে অনুমান করছেন তদন্তকারী অফিসাররা। সিবিআই ইতিমধ্যেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট কে কাজে লাগিয়ে সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই এদিন হানা দেয়। আর সেই ব্যক্তির সঙ্গে অনুব্রত মণ্ডলের যোগ থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে বলে সিবিআই সূত্রে খবর।কালো টাকার লেনদেনের হদিশ করতে গিয়েই সিবিআই এর নজরে আসে অনুব্রত মণ্ডলের ভোলেবাবা রাইসমিল। রাইস মিলকে ব্যবহার করে ধান কেনাবেচা দেখিয়ে ওই সমস্ত ভুয়ো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কালো টাকাকে সাদা করার কাজে ব্যবহার করা হত। তবে এখুনি ওই অ্যাকাউন্টগুলির লেনদেন বন্ধ করা হয় নি। ওই সব অ্যাকাউন্টে প্রায় ১০ কোটি টাকার হদিশ পাওয়া গিয়েছে। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৭৭ টি ভুয়ো অ্যাকাউন্টের মধ্যে রয়েছে মমতা মীর্ধা, কৃষ্ণ মুর্মু, সুন্দরী বাস্কি সহ একাধিক নামে। প্রত্যেকটি অ্যাকাউন্ট সেভিংস অ্যাকাউন্ট।যার মধ্যে প্রায় ৫৪ টি অ্যাকাউন্টে প্রায় ৪ কোটি টাকার লেনদেন করা হয়েছে।
সূত্রের খবর, ওই অ্যাকাউন্টগুলির সঙ্গে রাজ্য খাদ্য দফতরের যোগসূত্র রয়েছে। গরু পাচারের কালো টাকা সাদা করার জন্য খাদ্য দফতরকেও ব্যবহার করা হয়েছে? সেই প্রশ্নই সামনে আসছে। সিবিআই সূত্রে জানা যাচ্ছে, গরীব মানুষদের কাছ থেকে অল্প দামে নগদে ধান কেনা হত ওই সব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। এভাবে গরু পাচারের টাকা দিনের পর দিন সাদা করা হত বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের। খাদ্য দফতরের কাছে চাল বিক্রির বিনিময়ে পাওয়া টাকার চেক এই সমস্ত বেনামে থাকা অ্যাকাউন্ট গুলিতে জমা করা হয়েছে বলেই জানা গিয়েছে। কার সই রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।সিউড়ি এই ব্যাঙ্কে কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট রযেছে অনুব্রত মণ্ডল ও তার সঙ্গী রাজীব ভট্টাচার্যের। অনুব্রত মণ্ডল গ্রেফতারের আগেই দুটি অ্যাকাউন্টই সিজ করে সিবিআই।
সিবিআই সূত্রে খবর গিয়েছে, মূলত ২০২০, ২০২১ সালে সব চেয়ে বেশি একাউন্ট হয়েছে বলে খবর। সেই সময় এই ব্যাঙ্কের ম্যানেজার পদে ছিলেন ইন্দ গুড়ুং নামে আধিকারিক। বর্তমানে তিনি কীর্ণাহার শাখায় কর্মরত। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ব্যাঙ্কের বর্তমান ম্যানেজার অভিজিৎ সামন্ত বলেন," সিবিআই আধিকারিকরা এসেছিলেন। তাঁদের কিছু প্রশ্ন রয়েছে। আমরা যথা সম্ভব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে এর সঙ্গে সাধারণ গ্রাহকদের কোন সম্পর্ক নেই। তাঁরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।" অন্যদিকে যে সময় ওই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল সেই সময়ের সিউড়ির কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ছিলেন তৃণমূল নেতা ব্লক সভাপতি নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, "আমি বোর্ড চেয়ারম্যান ছিলাম। বোর্ডের আরও সদস্যরাও আছে। ব্যাঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে বোর্ডের কোন ভূমিকা নেই। যদি ব্যাঙ্কের লেনদেন সংক্রান্ত কোন অভিযোগ আমাদের কাছে আসত নিশ্চয় আমরা দেখতাম। কিন্তু আমাদের কাছে কোন অভিযোগ কখনও আসে নি এবং কেও জানায়ও নি। আর ব্যাঙ্কের লেনদেনের ব্যাপার ব্যাঙ্কের আধিকারিকরা বলতে পারবেন। আমার এই বিষয়ে কিছু জানা নেই।"
