
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: আলো, আনন্দ, আতশবাজি, প্রদীপ আর উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে গোটা বাংলা। দীপাবলি ও কালীপুজো মানেই আলোর উৎসব। ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানো, মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় এই বিশেষ উৎসব। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দের আড়ালেই প্রতি বছর বড় হয়ে ওঠে পরিবেশ দূষণের সমস্যা। বিশেষ করে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ে পরিবেশবিদদের। তাই উৎসবের আনন্দ অক্ষুণ্ণ রেখেই পরিবেশ রক্ষার বার্তা দিতে এখন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে সবুজ কালীপুজো।
কালীপুজো ও দীপাবলির সময় বাজি পোড়ানো বহুদিনের প্রচলিত রীতি। কিন্তু অতিরিক্ত আতশবাজি এবং শব্দবাজির ব্যবহার পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বাজি পোড়ানোর ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া, ধূলিকণা এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। এর ফলে বাতাসের গুণমান খারাপ হয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দূষণের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। শ্বাসকষ্ট, কাশি, চোখ জ্বালা এবং অ্যালার্জির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই দূষণ আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। শুধু বায়ুদূষণ নয়, শব্দদূষণও কালীপুজোর সময় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চ শব্দের বাজি থেকে নির্গত আওয়াজ শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হতে পারে। বিশেষ করে হৃদরোগী ও শব্দের প্রতি সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শব্দ শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে। ছোট শিশুদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। পাশাপাশি পোষ্য প্রাণী এবং পথের কুকুর-বিড়ালও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অনেক সময় অতিরিক্ত শব্দে তারা দিশেহারা হয়ে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়।
এখানেই শেষ নয়, বাজি পোড়ানোর পর জমে থাকা কাগজ, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য বর্জ্য পরিবেশের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। রাস্তা, জলাশয় এবং খোলা জায়গায় এই বর্জ্য ছড়িয়ে পড়লে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। অনেক বাজির অবশিষ্টাংশে থাকা রাসায়নিক উপাদান মাটি ও জলের গুণমানের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কয়েক ঘণ্টার উৎসবের আনন্দের মাশুল দিতে হয় প্রকৃতিকে দীর্ঘ সময় ধরে। এই পরিস্থিতিতে সবুজ কালীপুজোর গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবেশবান্ধব উৎসবের অর্থ উৎসবের আনন্দ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়। বরং এমনভাবে উৎসব পালন করা, যাতে মানুষের আনন্দের পাশাপাশি প্রকৃতি, প্রাণী এবং পরিবেশের সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়। শব্দবাজি ও অতিরিক্ত আতশবাজি এড়িয়ে প্রদীপ, মোমবাতি এবং বৈদ্যুতিক আলোর মাধ্যমে বাড়ি সাজানো যেতে পারে। পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে মণ্ডপ সাজানো এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোও এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সবুজ কালীপুজো পালনের ক্ষেত্রে মাটির প্রদীপের ব্যবহার বিশেষভাবে উৎসাহিত করা যেতে পারে। স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের তৈরি প্রদীপ কিনলে একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব উপায়ে আলোর উৎসব উদযাপন করা সম্ভব, অন্যদিকে তেমনই উপকৃত হবেন স্থানীয় কারিগররা। মণ্ডপ তৈরির ক্ষেত্রেও প্রাকৃতিক ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। পুজো শেষে বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা থাকলে পরিবেশের উপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। সবুজ উৎসবের ক্ষেত্রে প্রশাসন, পুজো উদ্যোক্তা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্দিষ্ট শব্দসীমা মেনে চলা, নিষিদ্ধ বাজি ব্যবহার না করা এবং নির্ধারিত সময়ের বাইরে মাইক বা লাউডস্পিকার না বাজানোর বিষয়ে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি পুজো কমিটিগুলির পক্ষ থেকে পরিবেশ সচেতনতার প্রচার চালানো যেতে পারে। মণ্ডপে পরিবেশ রক্ষার বার্তা তুলে ধরলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ দূষণ কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের সমস্যা নয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। তাই বছরে একবার পরিবেশ রক্ষার কথা ভাবলে চলবে না। প্রতিদিনের জীবনযাপনেও পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। উৎসবের সময় সেই সচেতনতার বাস্তব প্রয়োগ আরও বেশি জরুরি। কালীপুজো আমাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই এই উৎসবের আনন্দকে কোনওভাবেই ম্লান করার প্রয়োজন নেই। বরং একটু সচেতন হলেই উৎসবকে আরও সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, কয়েক মুহূর্তের আনন্দের জন্য পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কখনও কাম্য হতে পারে না। আলোর উৎসব সত্যিকারের সার্থক হয়ে উঠবে তখনই, যখন সেই আলো মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতির জীবনেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। তাই এবারের কালীপুজোর অঙ্গীকার হোক একটাই—শব্দ ও ধোঁয়ার দাপট নয়, পরিবেশবান্ধব উদযাপনেই হোক উৎসবের আসল আনন্দ।
