
কলকাতা, ৩১ মে: শনিবার ছয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যর আসন খালি হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, সোমবার থেকে এই প্রতিষ্ঠাগুলো হয়ে উঠেছে মুণ্ডহীন। বুধবার খালি হয়ে গেল আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যর আসন। সব মিলিয়ে ঘনীভূত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষার অনিশ্চয়তা।
প্রায় আড়াই মাস ধরে দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যর আসন খালি। মাস দেড় ধরে খালি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যর আসন। অস্থায়ী উপাচার্যও নেই এই দুই প্রতিষ্ঠানে। বিকাশ ভবন অর্থাৎ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর থেকে বারবার এই দুই আসন পূর্ণ করার জন্য লিখিত আর্জি গিয়েছে রাজভবনে, রাজ্যের সরকারি নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আচার্য তথা রাজ্যপালের কাছে। কিন্তু কাজ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বুধবার ফুরোলো আরও ছয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্যর কার্যকালের মেয়াদ।
বুধবার ফুরোলো যাদবপুর, বিএড, বাঁকুড়া, মালদার গৌরবঙ্গ, কৃষ্ণনগরের কন্যাশ্রী ও কোচবিহারের পঞ্চানন বর্মা প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্যর কার্যকালের মেয়াদ। এর পর ৮ জুন নাগাদ ফুরোচ্ছে সিঙ্গুরের রানি রাসমনি, উত্তর ২৪ পরগণার গাইঘাটায় হরিচাঁদ গুরুচাঁদ, পশ্চিম মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগর, ঝাড়গ্রামের সিধো কানহ ডহর, তমলুকের মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়, বোলপুরের বিশ্ববাংলা, দার্জিলিং— প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্যর কার্যকালের মেয়াদ। অর্থাৎ, এক কথায় অতি দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ না করা গেলে উল্লেখিত প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই পঠনপাঠন ডকে উঠবে। প্রবীন নানা শিক্ষাবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, কোনও রাজ্যে একসঙ্গে এতগুলো মুণ্ডহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা কারও জানা নেই। নতুন শিক্ষাবর্ষ সবে শুরু হয়েছে। এ সময়ে সব মিলিয়ে এই অনিশ্চয়তা রাজ্যের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় গভীর প্রশ্নবোধক চিহ্ণ এঁকে দিয়েছে। যার মাশুল গুনতে হচ্ছে বা হবে পড়ুয়া, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী— সবার ওপরেই।
শনিবার যাঁদের মেয়াদ ফুরিয়েছে, তাঁরা (বন্ধনীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম) হলেন অধ্যাপক ডঃ মানস সান্যাল (কল্যাণী), অধ্যাপক ডঃ নিমাই সাহা (বর্ধমান), অধ্যাপক ডঃ দীপক কর (সিধো কনহ ডহর), অধ্যাপক ডঃ মহুয়া দাস (বারাসত রাষ্ট্রীয়), অধ্যাপক ডঃ অনুরাধা মুখোপাধ্যায় (সংস্কৃত) ও অধ্যাপক ডঃ সাধন চক্রবর্তী (কাজী নজরুল, আসানসোল)। এর মধ্যে শেষোক্ত ব্যক্তির আসন নিয়ে সম্প্রতি আইনি জটিলতা শুরু হয়েছিল। সাধনবাবুর সঙ্গে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রারের বিরোধ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। অচল হয়ে আছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু কাজ। রাজ্যের উচ্চশিক্ষার অন্দরের বিশদ খবর যাঁরা রাখেন, তাঁদের বক্তব্য অদূর ভবিষ্যতে।
উল্লেখিত নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী তো দূরের কথা, অস্থায়ী উপাচার্যও নিয়োগ করা খুব সমস্যার। কারণ, স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ করতে গেলে সন্ধান কমিটি তৈরির পর যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হবে, সেটা কিছুটা সময়সাপেক্ষ। আর অস্থায়ী উপাচার্য কে নিয়োগ করবেন,রাজ্য না রাজ্যপাল, তা নিয়ে বিরোধ এই মুহূর্তে তুঙ্গে।
গত বছর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যর অপসারণের সময় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রাক্তন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর— দুজনই রাজ্যের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেআইনিভাবে উপাচার্য নিয়োগের প্রকাশ্য অভিযোগ আনেন। রাজ্য তা উপেক্ষা করলেও বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায়। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের রায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেই যায়। যদিও তার প্রাক্কালে সবে এ রাজ্যে রাজ্যপালের দায়িত্ব নিয়েছিলেন সিভি আনন্দ বসু। গোড়ায় তাঁর সঙ্গে রাজ্যের মধুচন্দ্রিমা পর্ব চলছিল। সেই সুবাদে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দফায় তিন মাসের জন্য অস্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ করা হয়। একে একে তাঁদেরই কার্যকালের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। রাজ্য-রাজ্যপালের মধুচন্দ্রিমা পর্ব এখন নিছকই অতীত। যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে অস্থায়ী উপাচার্য নিয়োগের বাতাবরণ একেবারেই নেই। তাহলে মুণ্ডহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধরে মুণ্ড কে, কবে, কীভাবে লাগাবেন? একমাত্র সময়ই এর উত্তর দিতে পারবে।
