
কলকাতা : কয়েক মাস বাদে দেশে সাধারণ নির্বাচন তথা লোকসভা ভোট। গোটা দেশ-সহ এ রাজ্যের দলগুলো শুরু করেছে মহারণের প্রস্তুতির। ২০২৩-এ বাংলায় যে কোনও ছোট বড় সব সময়েই আলোচনা হয়েছে। তা সে পঞ্চায়েতের ভোট হোক কিংবা সমবায় সমিতির নির্বাচন বা কোনও উপ নির্বাচন।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পূর্ব মেদিনীপুরের এগরায় নস্করপুর সমবায় সমিতির নির্বাচনে খাতাই খুলতে পারল না ঘাসফুল শিবির। মোট ভোটার ছিল ৯২৪। ভোট পড়ে ৮২৭টি। মোট আসন সংখ্যা ৯। আর ৯টি আসনের সবক'টিই যায় বিজেপি, বাম ও জাতীয় কংগ্রেসের দখলে।
কর্মচারী সমবায় সমিতির নির্বাচন ঘিরে ৮ এপ্রিল উত্তর ২৪ পরগনার কামারহাটি পুরসভায় তুলকালাম হয়। সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ককে ধাক্কা মারেন পুরসভার নিরাপত্তারক্ষী। গন্ডগোলের ছবি তুলতে গিয়ে আক্রান্ত হন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। প্রহসনের অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায় বামেরা। ১২-০ ভোটে জয়ী হয় তৃণমূল।
এপ্রিলেই উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারে ব্লক প্রাথমিক শিক্ষক কো-অপারেটিভ সোসাইটির নির্বাচনে ৯টি আসনের মধ্যে সব ক'টিতেই জেতে এবিটিএ নেতৃত্বাধীন বাম প্রগতিশীল শিক্ষক ঐক্য মঞ্চ।
অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে হুগলীতে কর্মচারী সমবায় সমিতির নির্বাচনেও বামপন্থী ইউনিয়ন তৃণমূলকে পরাস্ত করেছে। হুগলী ডিস্ট্রিক্ট সেটেলমেন্ট এমপ্লয়িজ কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের বোর্ড অফ ডিরেক্টর নির্বাচন হয়। আসন সংখ্যা ১২টি। যৌথ ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির অন্তর্ভুক্ত পশ্চিমবঙ্গ সেটেলমেন্ট কর্মচারী এবং পশ্চিমবঙ্গ গ্রামীণ ভূমি সংস্কার কর্মচারী সমিতির কর্মীরা।
গত সেপ্টেম্বর মাসে ফের তেহট্টে বামেদের জয় জয়কার। সমবায় সমিতির নির্বাচন নিয়ে উদাসীন ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। স্থানীয় নেতাদের এমনই মত। নেতৃত্বের উদাসীনতায় সমবায় নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পারল না দল। সুযোগের ফায়দা তুলে তেহট্টের ছিটকা গ্রাম পঞ্চায়েতের মৃগী কৃষি উন্নয়ন সমবায় সমিতির নির্বাচনে জয় সিপিএমের। ৬২ আসনের মধ্যে সিপিএম ১৮টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করেছে। বাকি ৪৪ টি আসনে সিপিএম এবং বিজেপি-র মুখোমুখি লড়াই হয় শান্তিপূর্ণভাবেই। এই নির্বাচনে সিপিএম ৫০-১২ আসনে জয়লাভ করে।
এর পর গত ৫ ডিসেম্বর গাইঘাটা সমবায় সমিতিতে (এল এস প্রাইমারি কো-অপারেটিভ এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট সোসাইটি) ৫১টি আসনে বামেরা ৪০টি আসন পায়। মাত্র ১১ টি আসন পায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস।
২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বড় নির্বাচন ছিল পঞ্চায়েত ভোট। গত বিশ-ত্রিশ বছরে বাংলায় প্রতিটা পঞ্চায়েত ভোটই ‘নিজগুণে’ মাইলফলক হয়ে রয়েছে। বরাবরই শাসক দল পঞ্চায়েত নির্বাচনে জিতেছে। ২০০৮ সালের
পঞ্চায়েত নির্বাচনে দুটি জেলা পরিষদ দখল করে নিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দল তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের জন্য সেই ভোটেই ভিত গাঁথা হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটে তেমন অবশ্য কিছু ঘটেনি। বরং ২০০৮ সাল বা ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে যে ধরনের সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছিল, তার তুলনায় এবার হতাহতের সংখ্যা কমই ছিল। সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা।
এ বছর সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলে দিয়েছিল সাগরদিঘিতে উপ নির্বাচন। সাধারণত দেখা যায়, উপ নির্বাচনে শাসক দলই জিতে যায়। কারণ, বিধানসভার একটা বা দুটো আসনে উপ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যে সরকারের বদল ঘটানো যায় না বলে মনে করে মানুষ। তাই সরকারের পক্ষেই মত দেওয়ার প্রবণতা থাকে। কিন্তু সাগরদিঘির উপ নির্বাচনে রাজ্যের শাসক দল শুধু হারেনি। বিশাল ভোটের ব্যবধানে তৃণমূলকে পরাস্ত করেন বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী বায়রন বিশ্বাস। বাম-কংগ্রেস জোটকে এর পর ‘সাগরদিঘি মডেল’ বলতে শুরু করেছিলেন অনেকেই।
রাজ্যের মন্ত্রী সুব্রত সাহার প্রয়াণের কারণে সাগরদিঘিতে উপনির্বাচন হয়েছিল। একুশের ভোটে তৃণমূল এই কেন্দ্রে জিতেছিল ৫০ হাজারের বেশি ব্যবধানে। উপনির্বাচনে দেখা যায় ৫০ হাজারের সেই হারা আসন কংগ্রেস জিতে নেয় ২২ হাজার ৯৮০ ভোটে।
ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ওই উপনির্বাচন ঘিরে রাজনীতি তাতছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা করতে যাওয়া, কংগ্রেস-বিজেপি আঁতাঁতের অভিযোগ, কংগ্রেস কর্মীর গ্রেফতার ঘিরে তোলপাড় হওয়া, ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে ওসি বদল— সব মিলিয়ে সাগরদিঘিতে উত্তেজনার স্রোত বয়ে গেছিল সাগরদিঘিতে। শেষমেশ ভোটে জিতে সাবেক জাতীয় দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে বর্তমান বিধানসভায় যান বাইরন বিশ্বাস।
তবে বাইরন কংগ্রেসের স্থির থাকেননি। সাগরদিঘির মডেলকে তিনি নিজেই ভেঙে দেন। তিন মাসের মধ্যে তৃণমূলে যোগ দিয়ে বলেন, জোড়াফুলের প্রার্থী হওয়ারই ইচ্ছা ছিল। টিকিট না পেয়ে কংগ্রেসে গেছিলাম। সাগরদিঘিতে এখন অনেকেই তাঁকে বায়রন ‘অবিশ্বাস’ বলে কটাক্ষ করেন।
সাগরদিঘির পর ধূপগুড়ি বিধানসভা আসনে উপ নির্বাচন হয়েছিল। সেই ভোটে আবার বিজেপির কাছ থেকে আসন ছিনিয়ে নেয় তৃণমূল। ৪৩০৯ ভোটের ব্যবধানে জিতে যান তৃণমূল প্রার্থী নির্মলচন্দ্র রায়। বাম কংগ্রেসের জোট এই ভোটে সাগরদিঘির মতো আর দাগ কাটতে পারেনি।
