kolkata

3 years ago

Kolkata News : কলকাতার হকার, পুরসভার দ্বিমুখী নীতিতে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য বিশ বাঁও জলে

Corporation vs Hawkers
Corporation vs Hawkers

 

কলকাতা, ২৫ মার্চ : একদিকে শহরের সৌন্দর্যায়ন ও নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের লক্ষ্যে রাস্তার ফুটপাথ দখলমুক্ত ও পরিস্কার রাখতে বলছে কলকাতা পুরসভা। অন্যদিকে, হকারদের ফুটপাথে বসার স্থায়ী অনুমতি দিচ্ছে। ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে বৃহত্তর কলকাতার ফুটপাথ। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কলকাতা পুরসভার ব্যবস্থাপনা ও নীতি প্রণয়নে। শহরের ফুটপাথ বেশিরভাগই বেদখল হয়ে রয়েছে।পুরসভার দাবি, এবার ফুটপাথকে মুক্ত করা হবে। আর সেই কারণেই নেওয়া হচ্ছে নয়া পদক্ষেপ। অবশ্যই এই নয়া পদক্ষেপ অত্যন্ত কঠোর। আগে দখলমুক্ত করতে গিয়ে পুর বিভাগের কর্মী ও আধিকারিকদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। কারণ, সেখানে পুরনিগমের নানা বিভাগের কর্মী ও আধিকারিকদের মধ্যে সব সময়ই দেখা গেছে বোঝাপড়ার অভাব। একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন না। এমনকী ফুটপাথ দখল মুক্ত করার জন্য এফআইআর করা বাকি বিভাগগুলির মধ্যে হলেও সমন্বয়ের অভাব নজরে এসেছে বারবার। সেই কারণে এবার কলকাতা পুরনগমের কমিশনারের সিদ্ধান্ত, এফআইআর করার পর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে অন্যান্য বিভাগের কর্মী ও আধিকারিকরা রাস্তায় নেমে ফুটপাথ দখল মুক্ত করবেন।

একই সঙ্গে বর্ষার আগে ফুটপাথের হকাররা দখলীকৃত অংশে দোকান আরও পোক্ত করছে। এর নেপথ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কোথাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত দেখা যায়। গোলপার্কে হকারদের ঝুপড়িকে ঘিরে বসছে কাঠামো। গড়িয়াহাটের ফুটপাতে হকারদের মাথায় প্লাস্টিকের ছাউনির বদলে টিনের শেড তৈরির কাজ চলছে। এ বার সেই টিনের শেডের উপরে সৌর প্যানেলও বসাতে চায় পুরসভা। বিতর্ক এড়াতে বিধায়ক তথা মেয়র পারিষদ (হকার পুনর্বাসন) দেবাশিস কুমার জানান, হকারদের টিনের ছাউনির মাথায় সৌর প্যানেল বসানো হবে। তবে বিষয়টি এখন আলোচনার স্তরে রয়েছে।

কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগগুলোর ভবনের চারপাশ রীতিমত দখলদারদের রাজত্ব হয়ে উঠেছে। বৈধ গৃহমালিক জানলা খুলতে পারেন না। গাড়ি রাখতে পারেন না। গ্যারাজ থাকলে গাড়ি ঢোকানো-বার করায় সঙ্কটে পড়েন। রয়েছে অন্য বিপদও। ২০১৯-এর ১৯ জানুয়ারি মাঝরাতে গড়িয়াহাট চত্বরে হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। আগুনে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি’। আগুনে পোড়া বিল্ডিংয়ের বাসিন্দাদের একাংশের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, “হকারদের কাগজ পোড়ানো থেকেই ছড়িয়েছে আগুন”। ওই ভবনের পাঁচ তলার বাসিন্দা শুভাশিস দে। আগুনে পুড়ে যায় তাঁর ফ্ল্যাট। মেয়র ফিরহাদ হাকিম পরদিন সকালে ঘটনাস্থলে যান। ভবিষ্যতে আগুনের আশঙ্কা রুখতে হকারদের জন্য পুরসভা বহু খরচ করে পৃথক স্টল তৈরি করে দেয়। কিন্তু হকাররা ফুটপাথ ছাড়তে রাজি হয়নি।

কলকাতার ফুটপাতে হকার বসা নিয়ে সমস্যা দীর্ঘ কয়েক দশকের। বছরের পর বছর এই নিয়ে কিছু করতে পারেনি পুরসভা। এই সমস্যা নিয়ে গত ১৯ নভেম্বর বিস্ফোরক মন্তব্য করেন খোদ মেয়র ফিরহাদ হাকিম। নিচু তলার পুলিশের দিকে আঙুল তুলে হাতিবাগানের হকার সমস্যা নিয়ে ফিরহাদ বলেন, ‘স্থানীয় থানার মদত ছাড়া হকাররা এভাবে ফুটপাতে বসতে পারে না। আমার কাছে প্রমাণ না থাকলেও আমি শুনেছি যে কিছু কিছু হকার ইউনিয়ন এবং পুলিশের একটি মান্থলি সিস্টেম আছে। এটা কিন্তু খুব খারাপ হচ্ছে। কারণ যদি একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তখন আমরা সবাই বিপদে পড়ব।’ এই অবস্থার মধ্যে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি টক টু মেয়র অনুষ্ঠানে শ্যামবাজারের একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে বলেন, “কিছু এলাকায় এভাবে হকারের জায়গা বিক্রি হচ্ছে। যদি অভিযোগ সত্যি হয় তবে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কেই গ্রেফতার করা উচিত।’’ এর মধ্যেই গত ১৭ মার্চ কলকাতা পুরনিগমে টাউন ভেণ্ডিং কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে ঠিক হয়েছে, এবার থেকে শংসাপত্র দেওয়ার পর প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ব্যবসা চালানোর অনুমতির জন্য বছরে ২০০০ টাকা ভাড়া নেবে পুরনিগম কর্তৃপক্ষ। প্রতি বছর এই পুনর্নবীকরণ হবে। যার মানে প্রতি বছর এই ২০০০ টাকা করে কলকাতা পুরসভাকে দিতে হবে শহরের হকারদের। অর্থাৎ, দখলদাররা হয়ে গেল পুরসভা-স্বীকৃত বৈধ ব্যবসাদার।

অনেক জায়গায় দখলদার হকারদের দাপটে নিকাশি সংস্কারের কাজ থমকে গিয়েছে। জল জমছে সংলগ্ন এলাকায়। এবার, কলকাতা শহরের কোথাও ফুটপাথ দখল করা থাকলে, সেই দখলদারের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হবে বলে বার্তা দেওয়া হয়েছে কলকাতা পুরসভার তরফ থেকে। জানানো হয়েছে, প্রথমে একটি নোটিস পাঠিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়ার পরে এই এফআইআর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর দখলদার ওই ব্যক্তি ফুটপাথের অংশ না ছাড়লে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে বিল্ডিং, সিভিল বিভাগের কর্মী ও আধিকারিকরা দখলমুক্ত করার কাজে হাত লাগাবেন বলেই জানা যাচ্ছে। আর এই ধরনের কাজে পুরনিগমের প্রতিটি বিভাগকে সমন্বয় রেখে কাজ করতে হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কলকাতা পুরসভার তরফে। এর ফলে আগুন লাগার আশঙ্কা কমবে, বাঁচবে বিদ্যুতও।

উল্লেখ্য, কলকাতা পুরনিগমের তরফে শহর এলাকায় রাস্তার ফুটপাথগুলি দখল মুক্ত করতে এর আগেও একাধিক পদক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছে। বেআইনিভাবে ফুটপাত দখল করে দোকান গজিয়ে ওঠার ফলে অনেকক্ষেত্রেই কার্যত সমস্যায় পড়তে হয় পথচারীদের। এখন দেখার আগামী দিনে কলকাতার ফুটপাতের চিত্র কতটা বদলায়। তবে ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। অভিজ্ঞরা নিশ্চিত, কোনও অঞ্চলের কোনও জবরদখলদারকে সরানো যাবে না। বাড়বে দখলদার হকারের সংখ্যা এবং দৃশ্যদূষণ। কমবে নাগরিক স্বাছন্দ্য। পুরসভার বাবুরা দায় এড়িয়ে যাবেন। ‘দেখছি’, ‘দেখব’ বলে এবং পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করে কাটিয়ে যাবেন জনপ্রতিনিধিরা। কলকাতা থাকবে কলকাতাতেই।

You might also like!